গত মাসে পাকিস্তানের একটি কার্গো জাহাজ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়, যা ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ঘটল। এই জাহাজের আগমন বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার পর থেকে, বাংলাদেশ সাধারণত পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, ঢাকা পাকিস্তানের কাছ থেকে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ক্রয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান থেকে আসা পণ্যের ওপর যে পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস পরিদর্শনের নিয়ম ছিল, সেটিও বাংলাদেশ বাদ দিয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো গত কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত ঘটেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পরিবর্তনগুলোর গতি বেড়েছে। এই সরকার পরিচালনা করছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগস্ট মাসে ব্যাপক গণবিক্ষোভের কারণে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর তাকে সর্বসম্মত নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা, যিনি তার শেষ দুই মেয়াদে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, এখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশের সরকার সম্প্রতি ইন্টারপোলকে হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
হাসিনার এই আকস্মিক পতন ভারতের জন্য চরম বিপদসংকেত হিসেবে এসেছে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) বরাবরই ভারতের সঙ্গে ঠাণ্ডা সম্পর্ক বলে ধারণা আছে। এখন, হাসিনার অনুপস্থিতিতে, বাংলাদেশে ভারতের মিত্রদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে শঙ্কা বা আলোচনা আছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভালো রাখতে চান, কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপ বিশেষত পাকিস্তানের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ভারতের দিক থেকে একরকম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন বাংলাদেশে যে ধরনের পরিবর্তন দেখছে, তাকে পররাষ্ট্রনীতির পুনর্বিন্যাস বলা যেতে পারে। এই ধরনের পুনর্বিন্যাস সাধারণত দুটি কারণে ঘটে : ১. বাহ্যিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন, যা একটি দেশকে তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। ২. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন, যা দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধরন বদলে দেয়। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তন ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের জন্য ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী রূপ নেবে, তা একেবারেই অনিশ্চিত।
শেখ হাসিনা, যিনি ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার আমলে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছিল, যা ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্য দিত। তিনি বাংলাদেশের ইসলামি চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন বলে দাবি করা হয়, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর জন্য তার দেশে কোনো আশ্রয়স্থল তৈরি হতে দেননি এবং ভারতীয় বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ভারতও এই সম্পর্কের প্রতিদানে হাসিনার শাসনকালীন গণতান্ত্রিক ঘাটতিগুলো উপেক্ষা করেছিল। ভারত বাংলাদেশের জন্য বাজার উন্মুক্ত করেছিল, দেশটির সঙ্গে রেল এবং সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়িয়েছিল। এভাবে দুদেশের মধ্যে একটি পরস্পর-সম্পর্কিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল। তবে এই দৃঢ় সম্পর্কের আড়ালে কিছু গভীর সমস্যা এবং উত্তেজনা রয়ে গিয়েছিল। এর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং কিছু দ্বিপাক্ষিক ইস্যু থেকে উদ্ভূত।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ থেকে অনিয়মিত অভিবাসনের সমস্যা সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। এটি বিশেষ করে জটিল হয়ে ওঠে যখন ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ভারতে ক্ষমতায় আসে। হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেও এই সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপি এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগায়। কিন্তু বিজেপির এই কঠোর অবস্থান প্রধানত ধর্মীয় পরিচয় এবং ইসলামফোবিয়ার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন হিন্দু সন্ন্যাসীর গ্রেপ্তার এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। যদি এই পরিস্থিতি বাংলাদেশি হিন্দুদের ভারতে আশ্রয় গ্রহণের দিকে ধাবিত করে, তবে অভিবাসন সমস্যাটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে। বিজেপি সরকার হয়তো এই অভিবাসীদের আশ্রয় দেবে, কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করবে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আরেকটি বিতর্কিত ইস্যু হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। যদিও ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি সফল সমাধান হয়, তিস্তা নিয়ে এখনো কোনো চুক্তি সম্ভব হয়নি। বিজেপি সরকার এই ইস্যুতে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অনুমোদন না পাওয়ার কারণে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সরকার তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং এই ইস্যু বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিরুদ্ধে বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তিস্তা চুক্তির অমীমাংসিত অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে। এটি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এমন কিছু ধারা রয়েছে, যা ভারতের জন্য দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ। এর একটি হলো দেশটিতে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। যারা শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা করেছে, তাদের মধ্যে ইসলামপন্থি ও ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলোও ছিল বলে দৃঢ় প্রচার রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের আশঙ্কা ও উদ্বেগ দূর করার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ যে নেওয়া হয়েছে, তা বলা যাবে না। এটি বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
ভারতের পক্ষ থেকে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতি তার নিজস্ব মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর এই প্রভাব নিয়ে ভারত সরকার সতর্ক। ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (জঅড), এই বিষয়গুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। তবে বিজেপি সরকার, যার ভিত্তি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদে, বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন বলে প্রতীয়মান হলে, তা তাদের রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বর্তমানে ভারতের হাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার উপায় খুবই সীমিত। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা উল্টো ভারতের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যদি ভারত ‘নাম ও লজ্জা’ নীতির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে, তবে তা পরিস্থিতি আরও বিপরীতমুখী করে তুলতে পারে। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস এবং জামায়াতের ইসলামপন্থি এজেন্ডা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের দীর্ঘদিনের শঙ্কা হলো, জামায়াত ও বিএনপির জোট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন একটি পরিবর্তন আনতে পারে, যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এই জোট বা জোটের কেউ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও জোরালো হতে পারে। শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ এতদিন ভারতের ওপর নির্ভরশীল কূটনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছিল। ভারতও কেবল আওয়ামী লীগ ও হাসিনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অভিযোগ এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতিগুলো ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। হাসিনার প্রস্থানের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকে একটি নতুন কূটনৈতিক অবস্থানে যেতে বাধ্য করবে।
ভারতের জন্য আরও শঙ্কার কারণ হতে পারে, বিশেষত সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি। ভারতের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে বাংলাদেশের নতুন সরকার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়। ভারতের অতিরিক্তভাবে হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের এই দুর্বল অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক এবং পররাষ্ট্রনৈতিক প্রেক্ষাপট ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। সীমান্তে অভিবাসন সমস্যা, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং তিস্তার মতো ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। ভারতের হাতে এই মুহূর্তে খুব বেশি কার্যকর উপায় নেই। কেবল সময়ই বলে দেবে, বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে এবং আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখবে।
ফরেন পলিসি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক
লেখক: কলামিস্ট ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো
