‘মানুষ মাত্রই উদ্যোক্তা, শ্রমিক নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় বাণিজ্য মেলার আয়োজন করতে হবে, যাতে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
গতকাল বুধবার রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে মাসব্যাপী ২৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। খবর বাসসের বাংলাদেশ একটা অপূর্ব সুযোগের দেশ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি ১৭ কোটি মানুষের একটি দেশ। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ হলো তাজা তরুণ-তরুণী। এ রকম শক্তি খুব বেশি দেশের কপালে নেই। এ কারণে বারবার বলছি, এই তারুণ্য শক্তিকে উন্মোচিত করার কথা। তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা। আরেকটা বিষয় বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করি, মানুষ মাত্রই উদ্যোক্তা, শ্রমিক নয়। অন্যের হুকুমে কোনো কিছু সৃষ্টি করা মানুষের পথ না। মানুষের পথ হলো নিজে সৃষ্টি করা। নিজের চিন্তায়, নিজের ভাবনায় যেটা আসে, সেটা তৈরি করা। এই মেলা আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়।’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার শক্তি মেলার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে ভবিষ্যতে মেলা হবে দেশ জুড়ে, জায়গায় জায়গায় এবং ঢাকায় হবে কেন্দ্রীয়ভাবে চূড়ান্ত মেলা। তরুণদের জন্য আমরা সুযোগ তৈরি করে দেব। মেলার প্রস্তুতি সারা বছর ধরে চলবে জেলা ও উপজেলায়। সেখান থেকে বাছাই করা হবে চূড়ান্ত পর্যায়ে মেলায় কারা অংশগ্রহণ করবে। ঢাকার মেলায় একজন আরেকজনকে দেখে শিখবে, বুঝবে এবং বুদ্ধি নেবে।’
বাংলাদেশের তরুণরা সম্ভাবনাময় ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘অনেক তরুণ-তরুণী কৃষি, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, আইসিটিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায় ভালো করছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা করছে ঘরে বসে সফটওয়্যার তৈরি করে বিক্রি করছে। কাজেই প্রত্যেক উপজেলায় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিন থেকে চারজনকে চিহ্নিত করে তাদের তালিকা করা হবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অংশগ্রহণের জন্য। সারা দেশ থেকে তরুণরা দলে দলে এদের দেখতে আসবে। বিদেশ থেকে আসবে। ঢাকায় মেলায় একজন আরেকজনকে দেখে উৎসাহ পাবে।’ এ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা শুধু বাংলাদেশের সেরা না, তাদের মধ্যে অনেকে দুনিয়ারও সেরা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপজেলা থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে আসা তরুণদের খরচ সরকার বহন করবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তাদের সমস্ত খরচ সরকার বহন করবে, কারণ তারা তো আমাদের পথপ্রদর্শক। তারা জাতিকে পথ প্রদর্শন করবে। দুনিয়াকে পথ প্রদর্শন করবে। অন্যরা তাদের দেখে শিখবে, বিনিয়োগ করতে আসবে। এখানে বিনিয়োগকারীরা আসবে জানার জন্য, বোঝার জন্য কোন ব্যবসাটা তার জন্য ভালো হবে।’
উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে টাকার অভাব কোনো বাধা নয় উল্লেখ করে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘টাকা নেই, এটা কোনো বিষয় না। বুদ্ধি থাকলে টাকা উপার্জন করা যায়। কাজেই আমরা চাই আমাদের তরুণ-তরুণী, বয়স্ক-বয়স্কা সবাই যেন উদ্যোক্তা হওয়ার শক্তি এই মেলার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারে। তাহলে এই মেলা সবার জীবনে বড় ধরনের প্রভাব রেখে যাবে আমাদের জন্য।’
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় তরুণদের জন্য আলাদা জায়গা রাখার পরামর্শ দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘বাণিজ্য মেলার একাংশ তরুণদের জন্য থাকবে, এখানে ২৫ বছরের নিচে হতে হবে এ রকম একটি শর্ত দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ২৫ বছরের নিচে যারা তারা এখানে কেউ আসবেন অন্যের কাছ থেকে শিখতে, আবার কেউ আসবেন অন্যকে শেখাতে।’
তরুণদের পাশাপাশি তরুণীরা ভালো ভালো ব্যবসা পরিচালনা করছেন উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘অনেক তরুণী রয়েছেন, যারা অসংখ্য কাজ করেন। ঘরে বসে শাড়ি বিক্রি করেন। গৃহিণী চার-পাঁচ বাচ্চার মা ব্যবসা করেন, ঘরে বসে রান্না করে খাবার সরবরাহ করেন। অর্ডার দিলে ঠিক সেই আইটেমগুলো রান্না করে সরবরাহ করছেন। চমৎকার বুদ্ধি খাটিয়ে এ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য যারা করছেন, তাদের কাজ তুলে ধরতে হবে।’
অধ্যাপক ইউনূস সবার সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও রপ্তানি সমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ‘রপ্তানি পণ্যের মানোন্নয়নে সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে আরও জোরদার, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুততার সঙ্গে সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।’
প্রধান উপদেষ্টা ফার্নিচার পণ্যকে বর্ষপণ্য ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিনি বর্ষ উদ্যোক্তা ঘোষণা করার বিষয়ে তার অভিপ্রায়ের কথা উল্লেখ করেন।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (চলতি দায়িত্ব) আব্দুর রহিম খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি যৌথভাবে মেলার আয়োজন করেছে। মেলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের সম্মানার্থে তৈরি করা হয়েছে ‘জুলাই চত্বর’ ও ‘ছত্রিশ চত্বর’। এ ছাড়া দেশের তরুণসমাজকে রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্বুদ্ধ করতে তৈরি করা হয়েছে ইয়ুথ প্যাভিলিয়ন।
আহতদের হেলথ কার্ড বিতরণ উদ্বোধন : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এ সময় অভ্যুত্থানে আহত দুজন শিক্ষার্থীর হাতে হেলথ কার্ড তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা। গণ-অভ্যুত্থানের এই দুই যোদ্ধা হলেন নরসিংদী ইউনাইটেড কলেজের শিক্ষার্থী ইফাত হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান ইমু।
গত বছরের ১৯ জুলাই আন্দোলনের সময় নরসিংদীতে গুলিতে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান ইফাত। পরদিকে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত ইসরাত বর্তমানে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট জেলায় হেলথ কার্ড বিতরণ করা হবে।
এ সময় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক খায়ের আহমেদ চৌধুরী প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, এখন পর্যন্ত চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৭৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৯ জনের দুই চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় ৪৫০ জনের এক চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক ড. মুহাম্মদ আবুল কেনান প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, এখন পর্যন্ত তাদের হাসপাতালে ২১ রোগীর হাত অথবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। কয়েকজন রোগীকে বিদেশে নেওয়ার জন্য বাছাই করা হয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান, তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, সম্পাদক সারজিস আলমসহ অনেকে।
