নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচল উপশহরের ৪ নম্বর সেক্টরের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে বসেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ২৯তম আসর। গতকাল বুধবার সকালে বাণিজ্যমেলার উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাণিজ্য মেলা শুরু হলেই পূর্বাচল সেজে ওঠে নতুন আঙ্গিকে। মেলার আশপাশের এলাকার চাকচিক্য অনেকটাই বেড়ে যায়। তবে আকাশছোঁয়া বাড়ি ভাড়া ও পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এ বছরও ব্যবসায়ীদের ভোগাচ্ছে। এতে মেলায় অংশগ্রহণে অনীহা দেখা দিয়েছে অনেকের মধ্যে।
এ বছর চতুর্থবারের মতো পূর্বাচলে বসেছে বাণিজ্য মেলার আসর। মেলায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্বাচল উপশহরে এখনো আবাসন ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। আশপাশের কয়েকটি বাড়িঘর রয়েছে। সেই সুযোগ নিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা। যাতায়াতের সুবিধার জন্য ব্যবসায়ীরা ও তাদের কর্মচারীদের থাকার জন্য মেলার আশপাশে কাছাকাছি এক মাসের জন্য ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। সেই সুযোগে পূর্বাচল ও কাঞ্চনের আশপাশে বাড়ির মালিকরা আকাশছোঁয়া বাড়ি ভাড়া আদায় করে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের এক প্রকার বাধ্য হয়েই বাড়ি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচল, কাঞ্চন ও এর আশপাশের এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া সাধারণত প্রতিমাসে ৮-১০ হাজার টাকা। প্রতি বছর বাণিজ্যমেলা এলেই যেন বাড়ির মালিকদের মধ্যে ভিআইপি ভাব চলে আসে। মেলায় আগত ব্যবসায়ীদের কাছে দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ১ মাসের জন্য নেওয়া হয়েছে ৫০-৬০ হাজার টাকা। অথচ রাজধানীর আভিজাত এলাকাগুলোতেও ভাড়া ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। গত বছরের তুলনায় এ বছর স্টলের দামও অনেক বেশি। সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। মেলার আশপাশে কোনো দোকান না থাকায় ছোটখাটো জিনিসের জন্য তাদের ১০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে কাঞ্চন বাজারে যেতে হয়। যেটা তাদের জন্য অনেক হয়রানির বিষয়।
গতকাল মেলা উদ্বোধন হয়ে গেলেও এখনো বেশ কিছু স্টল অপ্রস্তুত থাকতে দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ব্যবসায়ীদের আবাসন সমস্যা সমাধান না করায় তাদের মধ্যে মেলায় অংশগ্রহণের অনীহা বিরাজ করছে।
জানা গেছে, পূর্বাচলের প্রথম আসর থেকেই মেলায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীদের ৫ গুণ ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। মেলার চতুর্থ আসরেও একই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো থেকে এ আবাসন সমস্যা সমাধানের দাবি জানান মেলায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীরা। এবারের আসরে ৩৮টি প্যাভিলিয়নসহ মোট ৩৬১টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেলায় ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ ১১টি দেশ অংশগ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা আন্তর্জাতিক রপ্তানি মেলার প্রথম দিনে বেশিরভাগ স্টল নির্মাণের কাজ শেষ হলেও সবগুলো স্টল ছিল অগোছালো। প্রথম দিনে দর্শনার্থীদের ভিড় তেমন লক্ষ করা যায়নি। তবে মেলার দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন তরুণ ও যুবক বয়সী। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে তারুণ্যের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে। এদিকে, মেলার ভেতরে ও বাইরের রেস্তোরাঁগুলোতে নিম্নমানের খাবারে সয়লাব হয়ে রয়েছে। খাবারের মানের তুলনায় খাবার দাম অনেক বেশি বলে অভিযোগ মেলার ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের।
কথা হয় কাশ্মীরি ব্যবসায়ী সনুর সঙ্গে। তিনি বলেন, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে যখন মেলার আয়োজন করা হতো তখন ১৫-২০ হাজার টাকায় ফ্ল্যাট বাসা নিতে পারতাম। পূর্বাচলে মেলার অয়োজনের পর থেকে বাড়ির মালিকরা মেলাকে কেন্দ্র করে তার কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া নিয়েছেন একটি ফ্ল্যাটের জন্য। অনেক বেশি মনে হয়েছে তার কাছে।
আকবর নামে আরেক ভারতীর ব্যবসায়ী বলেন, আমরা ৪ জন থাকার জন্য মেলার পাশে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিই। ঢাকার আগারগাঁওয়ে মেলা থাকাকালে এমন ফ্ল্যাট এক মাসের জন্য ১৫-২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হতো। কিন্তু পূর্বাচলে এক মাসের জন্য ফ্ল্যাটের ভাড়া দিতে হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। আমার পরিচিত কয়েকজন আরও একটু ভালো ফ্ল্যাট ৬০-৭০ হাজার টাকায়ও ভাড়া নিয়েছেন। এছাড়া এখানকার খাবারের মানের তুলনায় দাম অনেক বেশি। বাড়াতে হয়েছে কর্মচারীদের বেতনও। এত খরচের পর এ বছর লাভ হবে কি না তা নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা সন্দিহান।
আলামিন নামে এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখি পূর্বাচলে কয়েকদিন পরপরই লাশ পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বাচলের ৩শ ফুট সড়কের সড়কবাতি থাকলেও আশপাশের রাস্তার অনেকগুলোতেই কোনো সড়কবাতি না থাকায় রাতে এক ধরনের ভয়ংকর পরিবেশ বিরাজ করে। এ কারণে আমরা রাস্তাঘাটে বের হতেও ভয় পাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে টাকা-পয়সা থাকে ছিনতাইকারী যদি নিয়ে যায় তাহলে আমাদের কে দেখবে। আমরা তো এখানে তেমন কাউকে চিনিও না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাড়ির মালিক বলেন, পূর্বাচল উপশহরের কাজ এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় আমাদের ফ্ল্যাটবাসা সারা বছর খালি পড়ে থাকে। একটি বাড়িতে সারা বছর অনেক খরচ রয়েছে। মেলার সময় ১ মাসের জন্য আমরা কিছুটা বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে সারা বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে নিলেও চেষ্টা করি ভাড়াটিয়াদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে।
এ ব্যাপারে ইপিবির সচিব ও বাণিজ্য মেলার পরিচালক বিভেক সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবছরই মেলা শুরুর দুই-তিনদিন পর স্টল নির্মাণ সম্পন্ন হয়। আশা করি দুই-একদিনের মধ্যে মেলার সব স্টল নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যাবে। এখানে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আসর বসেছে। মেলা সফলভাবে সম্পন্ন করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। ফ্ল্যাটবাসা ভাড়া অতিরিক্ত হওয়ার ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ফ্ল্যাট ভাড়া বেশি সেটি বাড়ির মালিকের ব্যাপার। এ ব্যাপারে তো আমার কিছু বলার নেই। তবে পূর্বাচলের সড়ক এখন অনেক ভালো হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা চাইলে ঢাকায় আরও কম খরচে থাকতে পারেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করার দাবির ব্যাপারে তিনি বলেন, যখন পূর্বাচলে আরও বেশি জনবসতি গড়ে উঠবে আমরা ব্যবসায়ীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করার ব্যাপারে চেষ্টা করব। আপাতত ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।
