ছোটবেলা থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানবদরদী। তিনি ছিলেন এতিম-অসহায়কে সহায়তা দানকারী। অবলা নারীকে সুমহান মর্যাদা দানকারী। উৎপীড়িত ও দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মানবজাতিকে চির মুক্তিদানকারী। মানবসেবায় তিনি ছিলেন জীবন্ত উপমা। নবুওয়াত লাভের আগেই মানবসেবায় গড়ে তুলেছিলেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে সেবামূলক সংগঠন। এর মাধ্যমে তখন থেকেই সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন। তার কাছে সাহায্য চেয়ে পায়নি এমন মানুষের সংখ্যা মেলানো ভার। নবুওয়াতের আগে ও পরে পুরোটা সময় তিনি মানুষের বহুমুখী সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। অসহায়দের সেবায় তার গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্য থেকে বিশেষ কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
দারিদ্র্য বিমোচনে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা : যে সমাজে দারিদ্র্যের হার বেশি সে সমাজ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি-অগ্রগতি লাভ করতে পারে না। রাসুল (সা.)-এর আবির্ভাবকালে আরবে কড়া সুদের প্রচলন ছিল। তখন নৈরাজ্যমূলক অর্থব্যবস্থায় সমাজ পরিচালিত হতো। সমাজের সবলরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। দুর্বলরা অর্থনৈতিক কোনো সহায়তা পেত না। সমাজের এই বৈষম্য দেখে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুখী-সমৃদ্ধ একটি সমাজ বিনির্মাণে কল্যাণকর অর্থব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। যেই সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সবাই স্বাবলম্বী হবে। এ লক্ষ্যে তিনি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তা হলো, বিত্তশালীদের সম্পদের জাকাত প্রদান, অন্যান্য দান-খয়রাতে উৎসাহ প্রদান, বাইতুল মাল থেকে কর্জে হাসানা প্রদান, ধনীদের কর্জে হাসানা প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ, সুদি কারবার নিষিদ্ধকরণ, জাকাত ছাড়াও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য কর থেকে অভাবী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকরণ, অসহায়, অক্ষম, এতিম ও মুসাফিরদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, কল্যাণকর অর্থব্যবস্থা প্রবর্তন ইত্যাদি। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করার ফলে দেশে ক্রমেই দারিদ্র্য বিমোচন হয়।
ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান : নিঃস্ব, দরিদ্র ও ক্ষুধার্তদের মধ্যে তিনি হাদিয়া বিতরণ করতেন। কারণ নিঃস্ব, দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে খাদ্য খাওয়ানো ইসলামের একটি উত্তম আমল। হাদিছে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? তিনি বললেন, তুমি (অভাবীকে) খাদ্য খাওয়াবে। (সহিহ বুখারি ১২)
দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ : অনেক ধনী-দরিদ্র, নির্বিশেষে সমাজের কিছু মানুষ দুর্যোগে নিপতিত হয়ে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, বন্যা, নদীভাঙনসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যেকোনো সংকটময় অবস্থায় অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার বিপদসমূহের কোনো একটি বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহতায়ালা তার আখিরাতের বিপদসমূহের মধ্য হতে একটি (কঠিন) বিপদ দূর করে দেবেন। (সহিহ্ মুসলিম ২৬৯৯)
শরণার্থীকে আশ্রয় ও সাহায্য প্রদান : শরণার্থী বলা হয় এমন মানুষদের যারা কোনো কারণে অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত হওয়ার সুনিশ্চিত ভয়ে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সুরক্ষার জন্য নিজের স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ কোনো জায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা মক্কার কাফের-মুশরিকদের দ্বারা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়ে প্রথমে আবিসিনিয়ায় এবং পরে রাসুল (সা.)-সহ মদিনায় হিজরত করেন। রাসুল (সা.) এ সব লোকদের সহায়তার প্রতি আহ্বান করে বলেছেন, তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (আবু দাউদ ৪৯৪১)
বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা : যে সমাজে বেকারের সংখ্যা বেশি সে সমাজের উন্নতি কম। এজন্য সমাজের প্রত্যেক কর্মক্ষম ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) জীবিকা উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, দাতার হাত গ্রহিতার হাতের চেয়ে উত্তম। (সহিহ্ বুখারি ১৪২৯) নিজ পরিশ্রমে উপার্জন করে খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে রাসুল (সা.) আরও বলেন, নিজের হাতে কাজ করে খাওয়ার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি।
কর্জে হাসানার ব্যবস্থা করা : বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে অনেক ব্যবসায়ী তাদের পুঁজি শেষ করে ফেলে। অনেকে একেবারে পথে বসে যায়। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তাদের কর্জে হাসানা দেওয়া যেতে পারে। এটা খুবই দরকার। অন্যথায় অনেক মানুষ সুদি ঋণ নিতে বাধ্য হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার অন্য কোনো মুসলিম ভাইকে দুবার ঋণ প্রদান করে তবে তার আমলনামায় এ অর্থ একবার সদকা করার ন্যায় হবে। (ইবনে মাজাহ ২৪৩০) তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক কর্জে সদকার সওয়াব রয়েছে। (তাবারানি ৩৪৯৮)
রক্তদান : প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় সঠিক জায়গায় রক্তদান করা জায়েজ। প্রাণ বাঁচানো এমনই পুণ্যময় কাজ যে, মহান আল্লাহ একজন লোক বাঁচানোকে সমগ্র মানবজাতি বাঁচানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, আর যে ব্যক্তি কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সব মানুষের জীবন রক্ষা করে। (সুরা মায়েদা ৩২)
এতিম ও অসহায়দের প্রতিপালন : সমাজে কল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে এক নম্বরে রয়েছে এতিম শিশু ও অসহায় মানুষজন। এ সব লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান, নিরাপত্তা দান, তাদের সম্পদ ন্যায়সংগতভাবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সবার কাঁধে বর্তায়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ব করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা বাকারা ৮৩)
বিধবাকে সহায়তা দান : যে সব নারীরা তাদের স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন, তাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন রাসুল (সা.)। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের সমস্যা সমাধানের জন্য ছুটোছুটি করে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় রাসুল (সা.) এ কথাও বলেছেন, সে যেন ওই ব্যক্তির ন্যায় যে সারা রাত নামাজ আদায় করে এবং সারা বছরই রোজা পালন করে। (সহিহ্ বুখারি ৫৩৫৩)
মানুষের উন্নয়নে কাজ করা : দেশের গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নে রাসুল (সা.) নানা উদ্যোগ নেন। সমাজে নানা রকম জনকল্যাণমূলক কাজ হাতে নেন। যেমন রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা, গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করে জনসমাবেশে যাওয়ার নির্দেশ, পরিবেশ রক্ষায় গাছপালা রোপণে উৎসাহদান, খাবার পানির বন্দোবস্ত করতে উৎসাহ প্রদান ইত্যাদি।
অসুস্থদের সেবা প্রদান : রাসুল (সা.) বলেছেন, একজন মুমিনের ওপর অন্য মুমিনের ছয়টি অধিকার রয়েছে। যথা : এক. যখন কোনো মুমিনের রোগ-ব্যাধি হয়, তখন তার সেবা-শুশ্রূষা করা। দুই. কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজা ও কাফন-দাফনে উপস্থিত হওয়া। তিন. কেউ দাওয়াত করলে তা গ্রহণ করা অথবা কারও ডাকে সাড়া দেওয়া। চার. সাক্ষাতে সালাম প্রদান করা। পাঁচ. হাঁচি দিলে জবাব দেওয়া। ছয়. উপস্থিত-অনুপস্থিত সব অবস্থায় মুমিনের কল্যাণ কামনা করা। (তিরমিজি ২৭৩৭)
সবার সঙ্গে সদাচরণ করা : নিজের প্রতিবেশী ও অন্যান্য লোকদের সঙ্গে সদাচরণ করা একটি মহৎ কাজ। অন্যদের জন্য নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকা প্রত্যেকের কর্বত্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) সদা-সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার পূর্ণ করার উপদেশ দিতেন। এমনকি আমার মনে হচ্ছিল যে, তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন। (সহিহ্ বুখারি ৬০১৫)
আজ আমাদের আশপাশে কত অভুক্ত, কত দুস্থ, কত অসহায়, কত দরিদ্র, কত দিনমজুর, কত আবালবৃদ্ধবনিতা হাহাকার করছে, সেটার খবর আমরা রাখি না। অথচ দুস্থ, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা করতে মানবতার নবী আমাদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আমাদের উচিত, রাসুল (সা.)-এর শিক্ষার আলোকে দুস্থ, অসহায় ও হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং তাদের দুঃখ লাঘবে প্রাণপণ চেষ্টা করা। তাই আসুন আমরা অসহায় ও দুর্যোগে কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াই। সহায়তার হাত তাদের প্রতি বাড়িয়ে দেই। মানবতার দাবি থেকেই তাদের পাশে থাকি।