দিনদুপুরে অধ্যাপক কাজী মোতাহারের অফিসে ডাকাতি

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:৫১ এএম

বামপন্থি রাজনৈতিক ও প্রাবন্ধিক হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ষাট দশকের শিক্ষার্থী। তিনি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ষাটের দশকে এ অঞ্চলে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশে দানা বাঁধছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই হায়দার আকবর খান রনোর হাতে পৌঁছে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘শিখা’। এটি ছিল হাতে লেখা, সাইক্লোস্টাইলে ছাপা। এর মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি ও রাজনীতির সঙ্গে সূত্রপাত ঘটে এই বামপন্থি নেতার। উত্তাল সে সময়ের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি তার ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ষাটের দশক’ নিবন্ধে।

রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন হায়দার আকবর খান। যেমন তার বিভাগীয় প্রধান ড. মতিন চৌধুরী পছন্দ করতেন না শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করুক। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবাই সাইকেলে চড়ে চলাফেরা করতেন। একজন মাত্র শিক্ষক গাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন, তিনি পলিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক অধ্যাপক নিউম্যান। মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষার্থীদের সাইকেলে চলাফেরা অধ্যাপক মতিন চৌধুরী সেটিও পছন্দ করতেন না। এদিকে হায়দার আকবর খান সাইকেলে চলাফেরা করতেন এবং রাজনীতিও করতেন। দুটি অপছন্দের কাজই তিনি করছেন বলে বিভাগীয় প্রধানকে এড়িয়ে চলতেন। কারণ, শিক্ষকের কাছে মিথ্যা তিনি বলতে পারবেন না, আবার সত্য বললে খেতে হবে ধমক। অবশ্য অধ্যাপক মতিন যে শিক্ষার্থীদের রাজনীতি করা পছন্দ করতেন না তার কারণও আছে। রাজনীতির জন্য শিক্ষার্থীরা প্রায় সময়ই নানা হঠাকারি কাজে জড়িয়ে পড়তেন। এর মধ্যে কিছু রোমহর্ষক আবার কিছু ধৃষ্টতাপূর্ণ হলেও বেশ মজার। এমন একটি কাণ্ডের হোতা ছিলেন স্বয়ং হায়দার আকবর নিজেও। সেটিও সবিস্তারে লিখেছেন তার ‘ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় : ষাটের দশকে’ প্রবন্ধে।

ঘটনাটি ’৬২-র ছাত্র আন্দোলনের সময়ের। বে-আইনি লিফলেট ছাপানোর জন্য কোনো ছাপাখানা পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন ফটোকপির যুগ ছিল না, তাই ছাপাখানার বিকল্প হিসেবে খোঁজা হচ্ছিল কোনো সাইক্লোস্টাইল মেশিনের কথা। তারা জানতে পারলেন একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন আছে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের অফিস ঘরে। সিদ্ধান্ত হলো, তারা মেশিনটি চুরি করবেন। তবে ঘটনার দিন চুরি নয়, করলেন ডাকাতি। ঘটনার দিন তারা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লেন অধ্যাপক মোতাহার হোসেনের ঘরে। তিনি হয়তো গণিতের কোনো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। তাদের দেখলেও কিছু বললেন না। তার সামনেই তারা ঘরের অপরপ্রান্তে মেশিনটির কাছে গেলেন, ভারী মেশিনটি ধরাধরি করে বের করলেন। তিনি একবার পাশ ফিরে তাকালেন মাত্র কিন্তু কিছুই বললেন না। এমনই নিমগ্ন ছিলেন কাজে। দরজা দিয়ে হায়দার আকবররা বের হওয়ার পরে অধ্যাপক মোতাহারের মনে হলো, আরে, এরা কারা? সাইক্লোস্টাইল মেশিনটি নিয়ে এরা কোথায় যাচ্ছে? এটা তো একটি চুরি (নাকি ডাকাতি?)! তখন তিনি বলে উঠলেন, ‘একি? ওটা নিয়ে গেল কেন? চুরি নাকি? অ্যা! ছেলেরা চুরি করল? অ্যা!’। এমনই আত্মভোলা ছিলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন আর এমন দুর্দান্ত অকুতোভয় আর নিবেদিত ছিলেন বামপন্থি হায়দার আকবর খান রনো। ক্লাস ছেড়ে বিভাগের ছেলেরা এমন কাণ্ড করলে কোনো বিভাগীয় প্রধানই বা পছন্দ করবেন? ফলে অধ্যাপক মতিন যে, রাজনীতি করাটা খুব বেশি পছন্দ করতেন সে জন্য মনে হয় তাকে খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না, তাই না?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত