অন্তর্র্বর্তী সরকার জুলাই গণ-অভুত্থানের ঘোষণাপত্র জারি করবে না, বরং সরকার এ প্রক্রিয়াকে ফ্যাসিলিটেট করবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরকার সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত জানাবে কবে এবং কীভাবে ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার ও অপূর্ব জাহাঙ্গীর।
এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ পাঠ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন, ছাত্রদের ঘোষণাপত্র পাঠের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি তাদের ‘প্রাইভেট ইনিশিয়েটিভ’ (ব্যক্তিগত উদ্যোগ)। এ বক্তব্যের একদিন পরই প্রেস সচিব জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরি করবে সরকার।
সরকারের পক্ষ থেকে এ বক্তব্য আসার পর ৩১ ডিসেম্বর ঘোষণাপত্র পাঠ থেকে সরে এসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দেলনের নেতারা শহীদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ সমাবেশ করেন। সমাবেশ থেকে ‘জুলাই প্রক্লেমেশন’ ঘোষণার জন্য অন্তর্র্বর্তী সরকারকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
প্রক্লেমেশনে ফ্যাসিবাদবিরোধী সবার অবদান স্বীকার করা হবে জানিয়ে ব্রিফিংয়ে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে একটু দেরি হবে হয়তো, তবে খুব বেশি দেরি নয়। সরকার চাচ্ছে সব পক্ষের মাধ্যমে এটা করবে। আশা করি শিক্ষার্থীরা একটু ধৈর্য ধরবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘোষণাপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে প্রস্তাবনা দিয়েছেন। ঘোষণাপত্র কিন্তু সরকার দেবে না। এটি আসবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবনা এবং সব রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সবার সম্মতিক্রমে ঘোষণাপত্র হলে সেটি বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে।’
উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘ঐকমত্য আছে বলেই শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে আমরা কী করব...এটা আলোচনায় যাবে। যেমন সংবিধান সংস্কার নাকি বাতিল করার প্রশ্নটি। এটি আমরা আলোচনা করে ঠিক করব। যারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল, তাদের সঙ্গে তো বসবই, সামাজিক, নারী, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা যারা গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে, সবার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলব, বসব।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তারা একটি ঘোষণাপত্র দেবেন। কিন্তু সরকার যখন অনুভব করল যে, বিষয়টি শুধু ছাত্রদের দিক থেকে গেলে সেটি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি ঘোষণাপত্র তৈরি করা হবে।’
মাহফুজ আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ঘোষণাপত্র তৈরি করা। এই সময় কিছুটা বাড়ানো হতে পারে।’ এজন্য শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারটি সংস্কার সাপেক্ষ। কমিশনগুলোর রিপোর্ট (প্রতিবেদন) এ মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে, এদের প্রস্তাবনাগুলো নির্বাচনকেন্দ্রিক হবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের (অংশীজন) সঙ্গে সরকার আলোচনা করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ করে নির্বাচন নিয়ে রূপরেখা তৈরি করবে সরকার।’
নির্বাচনের সময় নির্ধারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সংস্কারের মেয়াদই নির্ধারণ করবে নির্বাচন কখন হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি বা মধ্যমেয়াদি হবে কি না, তা রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এই উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমানে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ নাগরিকসেবা সঠিকভাবে পাচ্ছে না। এমন পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে বিষয়টি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই হবে।’
সাংবাদিকদের অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আলম বলেন, ‘একটি ঘোষণাপত্রে মূলত দুটি অংশ থাকে। প্রথম অংশে কী কারণে ঘোষণাপত্র, সেটি উল্লেখ থাকে। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ফ্যাসিজম ও এই ফ্যাসিজমের ধারাবাহিকতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ঘোষণাপত্রে বর্ণনা করা হবে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় অংশে রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তার উল্লেখ থাকবে। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। যেসব বিষয়ে সবার এরই মধ্যে ঐকমত্য আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। গত ১৬ বছরে যারাই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের দীর্ঘ সংগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে তাদের সবার কথা সাধারণ ও বৈশি^ক ভাষায় লিপিবদ্ধ থাকবে। জুলাই ঘোষণাপত্র ইনক্লুসিভ অ্যান্ড ইউনিফাইড ডকুমেন্ট হবে।’
এখন থেকে কোনো গানের আসর কিংবা কোনো মাজারে হামলা হলে সরকার ছাড় দেবে না উল্লেখ করে উপদেষ্ট মাহফুজ আলম বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর তথ্য আমরা সংগ্রহ করছি। যারা ভিকটিম তারা মামলা করুন। সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে।’
