আবহাওয়াবিদের হাতে সাবাড় গাছ

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:১৭ এএম

আবহাওয়ার তথা জলবায়ুর প্রতিদিনের উপাত্ত নিয়ে যিনি কাজ করেন, যিনি আগামীর আবহাওয়া কেমন হবে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত দেন, তিনিই কি না আবহাওয়ার জন্য উপকারী উপাদান গাছ কাটলেন! আবহাওয়ার জন্য যা উপকারী পরিবেশের জন্যও তা উপকারী।

গাছ কাটার ব্যাপারে তিনি কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেননি। তবে গাছ কাটার পর বন অধিদপ্তরের কাছে ভুল স্বীকার করেছেন তিনি। ঘটনাটি চট্টগ্রামের।

চট্টগ্রাম আমবাগান ভূকম্পন কেন্দ্রে প্রায় অর্ধশত গাছের ডালপালা ও গাছ কেটেছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক নুরুল করিম। ঘটনার পর বন অধিদপ্তরের একটি টিম ওই এলাকা পরিদর্শন করেছে।

গাছকাটার কথা স্বীকার করে নুরুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশি গাছ কাটিনি। কয়েকটি গাছ বেশি হেলে ছিল, সেগুলোর ডালপালা কেটেছি।’

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গাছ বা ডালপালা কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও বন অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। সেটা নেওয়া হয়েছে কি না, প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অগ্রিম অনুমোদন নেইনি। তবে গাছ কাটার পর অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছি।’

বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের আমবাগান ভূকম্পন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, দুই পাহাড়ের মাঝের নিচু জায়গায় (অফিসের পশ্চিম পাশে) সাত-আটটি গাছ পুরো কেটে ফেলা হয়েছে। ভূমিকম্প অফিসের পাশের বড় মেহগনি গাছের দুটি মোটা ডাল কাটা হয়েছে। কলোনির শেষাংশে কিছু সেগুনগাছ কাটা হয়েছে। অফিস ভবনের উত্তর দিকের পাহাড়ের প্রায় সব গাছের ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছে।

কলোনির বাসিন্দা এবং অফিসের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাছগুলো গত মাসে কাটা হয়েছে। নিরাপত্তা প্রহরী মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘যাকে গাছ কাটার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তিনি বেশিরভাগ গাছ কেটে নিয়ে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে, কখনো বন বিভাগ থেকে লোক এসে তদন্ত করছে।’

জানা গেছে, গাছ কাটার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফিরিঙ্গীবাজারের ব্যবসায়ী মন্টু চৌধুরীকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার সঙ্গে গাছ কাটার বিষয়ে কথা হয়েছিল ঠিকই। পরে আমাকে কাজ না দিয়ে আমবাগান নালাপাড়া বস্তির লোকদের দিয়ে গাছ কাটানো হয়েছে।’ 

এভাবে গাছ কাটার বিধান নেই জানিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘গাছ কাটার আগে আমাদের চিঠি দিতে হয়। আমাদের টিম গিয়ে গাছগুলো পরিমাপ করে কত ঘনফুট কাটা হবে এবং এর দাম কত হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়। পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থা সে অনুযায়ী গাছ কেটে অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে থাকে।’

গত ৭ জানুয়ারি আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক নুরুল করিম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় চট্টগ্রামের উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে। চিঠিতে সরকারি আইন অনুযায়ী গাছগুলো কাটা হয়নি বলে ভুল স্বীকার করেন তিনি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, আবহাওয়ার উপাত্ত সঠিকভাবে নিরূপণ করার জন্য গাছগুলো কাটা দরকার ছিল।

এ বিষয়ে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘদিন ওই ভূমিকম্প অফিসে কাজ করেছেন। গাছ কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গাছ বা ডালপালা কাটার একটা নিয়ম আছে। চাইলেই গাছ কাটা যায় না। বন বিভাগের অনুমোদন এবং তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দর চূড়ান্ত করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া গাছ কাটার বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছি।’

উল্লেখ্য আমবাগান আবহাওয়া অফিসে সমতল ও পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। ভূমিকম্প কেন্দ্রটি পাহাড়ের ওপর। একসময় সারা দেশের একমাত্র ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র ছিল এ পাহাড়ে। ২০০৭ সালে দেশের ১০ এলাকায় ডিজিটাল ভূমিকম্প কেন্দ্র বসানো হয় এবং এসব কেন্দ্রের তথ্য-উপাত্ত ঢাকার আগাঁরগাওয়ের অফিসে বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। ভূমিকম্পের পাশাপাশি আমবাগান ভূকম্পন কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতাসহ আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত