পেঁয়াজের দরপতনে সংকটে চাষিরা

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১১ এএম

পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের বাহিরচর গ্রামের বাসিন্দা রাব্বি হোসাইন। তিনি সাত বিঘা জমিতে চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছেন। হালের গরু-ছাগল, অন্যান্য ফসল ও কিছু জিনিসপত্র বিক্রির পুরো টাকাই লগ্নি করেছেন পেঁয়াজ আবাদে। কিন্তু রোপণ মৌসুমে অতিবৃষ্টির ফলে পচে যায় প্রথম দফায় লাগানো পেঁয়াজ। এতে দ্বিতীয় দফায় পেঁয়াজ লাগানো ও পরিচর্যায় বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয় তাকে। সবমিলিয়ে তার ঋণ পাঁচ লাখ টাকার মতো।

শর্ত ছিল মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠলে ফেরত দেবেন ঋণের টাকা। এজন্য মাঝে মধ্যেই সুরুজদের বাড়িতে আসছেন ঋণদাতারা। কিন্তু চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের যে ফলন ও দাম চলছে, তা দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয়। তাই খানিকটা ফেরারি হয়ে চলার উপক্রম হয়েছে তাদের। খুব শিগগির পেঁয়াজের দাম না বাড়লে ফেরারিই হতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন রাব্বি।

রাব্বি বলেন, ‘শুরুতে ৫-৬ হাজার টাকা মণ দরে বীজ কিনে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেছিলাম। বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় ৭-৯ হাজার টাকায় বীজ কিনতে হয়েছে। পুরো আবাদ বাবদ বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকার ওপরে। সেখানে যা ফলন হয়েছে তাতে ৭০-৮০ হাজার টাকার বেশি ওঠার উপায় নেই। এখন যে অবস্থা আমাদের পালাতে হবে। এই ঋণ পরিশোধের কোনো উপায় নেই।’

এই দুর্দশা শুধু রাব্বির নয়, মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করা জেলার প্রায় সব চাষির। চাষিদের দাবি, মণপ্রতি উৎপাদন খরচ দুই হাজার টাকার ওপরে হলেও বর্তমান বাজার ১০০০-১৫০০ টাকা। বিগত মৌসুমের মতো বিঘাপ্রতি ফলন ৬০-৭০ মণ প্রত্যাশা করলেও গড় ফলন হয়েছে ৩৫-৪০ মণ। ফলন বিপর্যয় এবং দাম কম হওয়ায় ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন চাষিরা। এ অস্বাভাবিক দরপতনের জন্য ভরা মৌসুমে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন চাষিরা। দ্রুত আমদানি বন্ধ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।

চরতারাপুরের সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘বীজের দাম বেশি থাকায় আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ লাগিয়েছিলাম। এতে মোট ৬০-৭০ মণ ফলন হয়েছে। ১২০০ টাকা করে ২-৩ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। এত কম দামে লোকসান হয়েছে। তাই ভয়ে জমি থেকে পেঁয়াজ তোলা আপাতত বন্ধ রেখেছি।’

গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মুড়িকাটা পেঁয়াজের জমি করেছেন চাষি আমিরুল ইসলাম। তিন বিঘায় যে ফলন হয়েছে তাতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে মহাসংকটে পড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গরু-বাছুর সব শেষ। সব বিক্রি করেছি, এরপর লোনও নিয়েছি। আমদানির কারণে পেঁয়াজের দাম একদম নেই। একেবারে শেষ হয়ে গেলাম। এভাবে নিঃস্ব হলে পেঁয়াজ চাষে ধীরে ধীরে সবাই আগ্রহ হারাবেন।’

কয়েকজন আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম দিকে প্রতিমণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ ২২০০-২৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ১০০০-১৩০০ টাকায় নেমেছে। এরপর বাজার কিছুটা বেড়ে ১৫০০-১৭০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। এতে কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। কমপক্ষে প্রতিমণ ২৫০০ টাকায় বিক্রি করতে পারলে চাষিরা লাভের মুখ দেখবেন।’

এ বিষয়ে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. জামাল উদ্দিন বলেন, পেঁয়াজের দরপতনে চাষিরা মারাত্মকভাবে লোকসানে পড়বেন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের পরামর্শে আমরা বাজারে বাজারে ঘুরে ব্যবসায়ীদের কারসাজি না করতে অনুরোধ জানাচ্ছি। জমি থেকে দ্রুত সব পেঁয়াজ না তোলার পাশাপাশি চাষিদের বাজারে অল্প অল্প করে পেঁয়াজ আনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আমদানি বন্ধের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। আশা করছি এ সংকট কাটিয়ে চাষিরা লাভবান হবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত