হলিউডের আগুন আমাদের শিক্ষা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৪২ এএম

‘হলিউড’ নামটি শুনলেই মনে হয়, আলো ঝলমলে এক স্বপ্নের জগৎ। আইকনিক পাহাড়ে জ্বলজ্বল করা হলিউড নামটি, যেখানে একশ বছরের বেশি সময় দুনিয়ার সবচেয়ে দামি ও বিখ্যাত সিনেমার শহর অবস্থিত। স্বপ্নের নায়ক-নায়িকারা সেখানে রচনা করেন এক পরাবাস্তব জগৎ। সেই জগৎ দেখে আমরা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যাই। প্রাচীনকালে দেবতাদের রাজ্যর কল্পিত আলোর ছটায় মানুষ যেমন বিমুগ্ধ হতো তেমনি এখনকার দিনে স্বপ্নালু হয়ে পড়ে হলিউডের আলোয়। অথচ, হলিউডে এখন জ্বলছে ভিন্ন ধরনের আলো। অতি বাস্তব এক আগুনের ছটায় হলিউড ও আশপাশের বিস্তৃত এলাকা দাউ দাউ করে জ্বলছে। বিনোদন জগতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লস অ্যাঞ্জেলেসে এ দাবানলের সূত্রপাত হয় গত মঙ্গলবার। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ছয়টি আলাদা দাবানল সৃষ্টি হয়েছে। দাবানলে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ১৬-তে দাঁড়িয়েছে বলে শেষ খবর পর্যন্ত জানিয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেডিকেল এক্সামিনার কার্যালয় (মৃত্যুর তথ্যদানকারী স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যালয়)। তার মধ্যে পাসাডেনার কাছে ইটন দাবানলে ১১ জন এবং প্যালেসেইডস দাবানলে ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা। দাবানলে মালিবুর জনবসতিপূর্ণ এলাকার ধ্বংসচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে মেয়র স্টুয়ার্ট বলেন, ‘প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ের পাশ ধরে সুন্দর সুন্দর বাড়িগুলো শেষ হয়ে গেছে। বিগ রকের জনবসতিরও একই অবস্থা। সামনে আমাদের পুনর্নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞে নামতে হবে। কিন্তু আমরা দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি।’

আগুনে এখন পর্যন্ত লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রায় দুই হাজার অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে শতকোটি ডলারের বাড়িও রয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অন্তত ৩  লাখ ১১ হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দাবানলে এখন পর্যন্ত ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছে আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট অ্যাকুওয়েদার। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি হলিউডের অনেক তারকা ও শীর্ষ ধনীদের বিপুল সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে চলা আগুন এখনো নিভছে না এবং স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বমানবতা এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবাই প্রার্থনা করছেন আর ক্ষতি না হোক, মানুষ ও প্রাণপ্রকৃতির রক্ষা হোক। এই চাওয়া মানুষ হিসেবে অতি স্বাভাবিক। কিন্তু, এর বিপরীত অন্য আরেকটা চিত্র দেখা গেছে। এই হলিউডেরই কিছু প্রভাবশালী গত দেড় বছর ধরে ফিলিস্তিনের জঘন্য গণহত্যায় সমর্থন দিয়েছে। গাজায় প্রতিদিন ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহতদের নিয়ে তাদের কোনো রকম সহানুভূতি তো নেই-ই, উল্টো দখলদারদের উৎসাহ দিতে দেখা গেছে। মার্কিন সরকারও বিপুল অর্থ ও সমর্থন দিয়েছে ঘৃণ্য দখলদারদের। ফলত, মানবিক এই বিপর্যয়েও কেউ কেউ সেইসব তারকাদের ক্ষতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। কেউ কেউ বলতে চাচ্ছেন, এ প্রকৃতিরই বিচার। যেইসব হলিউড তারকারা গাজার শিশুদের নৃশংস খুনে উল্লাস করেছে, তাদের স্বর্বস্ব পুড়ে যাওয়াটাকে কর্মফল বলে আখ্যা দিয়েছেন কেউ কেউ। স্বাভাবিকভাবেই, এর বিপরীতে মানবিক মানুষেরা প্রতিবাদ করেছেন। তারা প্রশ্ন তুলছেন, তবে যে ঢাকার বেইলি রোডে এক হোটেল বিস্ফোরণেই বহু মানুষ মারা গেল সেটা কার পাপে? কিংবা নিমতলীর নৃশংস আগুন, অথবা তাজরীন গার্মেন্টস বা রানা প্লাজার সিস্টেমেটিক হত্যাকা-? সেগুলো কার পাপে? আর ধনীদের আগুনে যে খুশি হচ্ছেন, তাদের এই সব সম্পদ তো বীমা করা। বীমা থেকে তারা তো ঠিকই ক্ষতিপূরণ পাবেন। গরিব বলেন আর গাজার অসহায় শিশুরা বলেন, তাদের ক্ষতির সঙ্গে তো এর তুলনাই চলে না।

যুক্তির খাতিরে এই আলাপটা স্বাভাবিক। গরিব দেশের অসহায় মানুষ প্রতিদিন মরে, পোড়ে, ছাই হয়ে যায়। কেউ কেউ সিস্টেমেটিক হত্যার শিকার হয়, কেউ কেউ পুঁজিবাদের থাবায়। এসব অঞ্চলের মানুষ যে মানবেতর জীবন কাটায় তা তো মরণের চেয়েও খারাপ। এরা প্রতিদিনই মারা যায়। পুড়ে যায়। কিন্তু, মানুষের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে যন্ত্রের মতো কেবল যুক্তি দিয়ে আলাপ করে না। মানুষের যুক্তি রচিত হয় ঐতিহাসিক ম্যাটেরিয়ালিজম আর নানা রকম আবেগের প্রতিঘাতে। ফলে, ধনী লোকের আগুনে পোড়ায় প্রতিদিন বঞ্চিত হওয়া লাখো গরিবরা উল্লসিত হয়। সিনেমায় যেমনটা দেখা যায় যে, গোটা সময় জুড়ে মার খাওয়া গরিব শেষের এক দৃশ্যে বিজয়ে দারুণ তৃপ্তি পায়। তারা অপেক্ষা করে দৈবশক্তির। দৈব কর্মফলের। এছাড়া গরিবের আর করারই কী আছে? জার্মান দেশের জনৈক কার্ল মার্ক্স যেমনটা বলেছিলেন যে, ধর্ম হচ্ছে গরিবের সেই আফিম যা তার ক্ষতবিক্ষত জীবনকে কিছুটা উপশম দেয়, আরাম দেয়। এই যে দৈব কর্মফল, এ হচ্ছে সেই আফিমেরই রেশ। দেখো দেখো, আমাদের যে প্রতিনিয়ত তোমরা আগুনে পোড়াও, তোমরা কিন্তু এর থেকে অনেক বড় কোনো শক্তির আগুনে একদিন পুড়ে মরবে।

অক্ষম, বঞ্চিত গরিব আগুনের দৃশ্যেও তাই উল্লসিত হয়। এ তার মানবিকতা হারানো নৃশংসতা নয়, বরং চরম অক্ষমতা। এই অক্ষমতা সমাজে সাম্য আনতে না পারার, শ্রেণি সংগ্রামে ব্যর্থ হওয়ার। দুঃখের বিষয়, ইন্সুরেন্সের আওতায় থাকা ধনীদের এতে কিচ্ছুটি আসলেই হবে না। বরং গরিবের এই অক্ষমতাকে পাঠ করা হবে মানবতাহীনতায়। আরও হাজারো অসম যুদ্ধের কারণ হিসেবে একে তুলে ধরা হবে। কেউ কেউ অবশ্য এই আফিমের ব্যবসাতেও লিপ্ত হবে। শ্রেণি সংগ্রামের বদলে প্রকারান্তরে অসম ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ছলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মঞ্চায়ন করবে। হলিউডের আগুন অতি দ্রুত নিভে যাক। বাঁচুক প্রাণ প্রকৃতি। আমাদের উপলব্ধি হোক যে, অসাম্যের আগুন যতদিন জ্বলবে, নগরের সঙ্গে সঙ্গে দেবালয়গুলোও পুড়তে থাকবে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত