আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশে লক্ষণীয় পরিবর্তন এলেও বন্ধ হয়নি রেকার বাণিজ্য। এখনো সড়ক-মহাসড়কে রেকারের নামে অর্থ আদায় করছেন কিছু পুলিশ সদস্য। ভুক্তভোগী গাড়ির চালকরা বলছেন, পুলিশের রেকার হয়রানি সীমাহীন।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে রেকার বাণিজ্য নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে সবকটি মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিট প্রধানদের দিকনির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। তাছাড়া পুলিশ সংস্কার কমিশনও রেকার বাণিজ্য বন্ধ করতে পরামর্শ দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি কিংবা রাস্তায় কোনো যানবাহন হঠাৎ বিকল হলে সেগুলো উদ্ধারে ডাকা হয় রেকার। বিনিময়ে ওই যানবাহনের মালিকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘ফি’ বা মাসোহারা নিচ্ছে পুলিশ। ছোট যানবাহন যেমন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, মিশুক ও রিকশা জব্দ করেও নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের রেকার ‘ফি’। অভিযোগ রয়েছে, এমন ‘রেকার হয়রানি’ থেকে রক্ষা পেতে যানবাহনের চালকরা বাধ্য হচ্ছেন পুলিশকে মাসোহারা দিতে। প্রতি মাসে মাসোহারা থেকে আয় হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। আর এসব চাঁদা যায় কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে। রেকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপপরিদর্শকরা (এএসআই) ব্যাটারিচালিত এসব বাহন থেকে চাঁদা তুলতে বহিরাগতদেরও ভাড়া করেন। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও নানা কৌশলে রেকার দিয়ে অর্থ আদায় করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেকার বাণিজ্য নিয়ে নানা অপকর্ম হচ্ছে তা সত্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। গত মাসে আইজিপি স্যারের নির্দেশে রেকার নামে টাকা উত্তোলন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের ইউনিটপ্রধানদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী দু-এক মাসের মধ্যে রেকার বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো যানবাহন রেকার করলে কোনো অর্থ দিতে হবে না। পুলিশ সংস্কার কমিটিও রেকার বাণিজ্য বন্ধ করার সুপারিশ করেছে। ঢাকা মহানগরসহ সবকটি শহরাঞ্চলে রেকার বন্ধ করতে সপ্তাহখানেক আগেও বলা হয়েছে। পুলিশের কোনো সদস্য নির্দেশ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। অসাধু পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দাদের মাঠে নামানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী যানবাহন চালকরা অভিযোগ করেছেন, একটি গাড়ি ধরা পড়লে তাকে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একবার জরিমানা করার পর পরের দিন আবারও জব্দ হচ্ছে। যতবার জব্দ করা হয় ততবার টাকা করে ‘রেকার ফি’ হিসেবে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। তবে এসব প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতেই পুলিশের মাসিক মাসোহারার দিকে চলে যান চালকরা। বছর খানেক আগে সড়ক ও মহাসড়কে মামলা দেওয়ার নামে পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি।
তারা জানিয়েছে, পুলিশের চাঁদাবাজি সীমাহীন। পণ্য পরিবহন খাত দেশের অর্থনৈতিক খাতকে চলমান রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও পণ্য পরিবহন শিল্প দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পণ্য পরিবহন শিল্পে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত রয়েছেন। বিশেষ করে দেশের সব সড়ক-মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ কথায় কথায় মামলা ও কাগজপত্র কোনো কারণবশত ক্রটি থাকলে এবং ঠুনকো অজুহাতে রেকার দ্বারা ডাম্পিংয়ের ভয় দেখিয়ে প্রতিদিনই লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। রেকার বাণিজ্য, ফিটনেসের নামে পুলিশের চাঁদাবাজিতে পণ্য পরিবহন মালিকরা অতিষ্ঠ, লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত বলে অভিযোগ করা হয়। এতে করে সারা দেশে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দেশের প্রায় সাড়ে ২১ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক আছে। যানবাহন মহাসড়কে উঠতে গিয়ে দু-এক মিনিটের জন্য রাস্তা বন্ধ হলেই বাস ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ শত শত গাড়ি রং সাইডে (উল্টোপথ) দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এতে করে দুদিক থেকেই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, যা যানজট পরিস্থিতিকে বেসামাল করে তোলে। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনার কারণে দুর্ঘটনাকবলিত বা আটকে পড়া গাড়ি সরানোর জন্য ঘটনাস্থলে রেকার ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোনো যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হলে রেকার দিয়ে সরানোর নামে চাঁদা উঠানো হচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায় মহাসড়কে বিকল ও দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি অপসারণের জন্য ব্যবহৃত রেকারকে ঢাল বানিয়ে রীতিমতো বাণিজ্য করছেন মহাসড়কের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এমনকি চলন্ত অটোরিকশা আটকে ‘রেকার’ ব্যবহার দেখিয়ে গায়েবি বিলের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মহাসড়কে চলাচলকারী অবৈধ যান আটকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে মাসিক চুক্তি করা সিএনজি, অটোরিকশা, ও ইজিবাইক আটকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চলাচল করা ইজিবাইক চালক রহিম মিয়া বলেন, মাস খানেক আগে আমার ইজিবাইক গাড়িটি চলন্ত অবস্থায় আটক করা হয়। তাই রেকার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। এমনকি আশপাশে কোনো রেকারও ছিল না। অথচ আমার কাছ থেকে রেকার ভাড়া নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলো। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহিত করার পরও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। হাইওয়ে পুলিশ এসব অপকর্ম বেশি করছে। বেশ কয়েকজন ইজিবাইক চালক আরও বলেছেন, মাসিক ভিত্তিতে চুক্তির পর তারা মহাসড়কসহ পুরো শহরে নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাতে পারেন। এজন্য তাদের স্টিকার দেওয়া হয়। যে চালক মাসিক চুক্তিতে যায় তার মোবাইল নম্বর হাইওয়ে পুলিশের কাছে থাকে। তাই যেসব গাড়ি মাসিক অর্থে চুক্তি করা সেগুলো হাইওয়ে পুলিশের নাকের ডগার ওপর দিয়েই চলে। আর যারা মাসিক টাকা দেয় না তাদেরই জরিমানা করা হয় বলে জানান তারা। নিদিষ্ট অঙ্কের চাঁদা না দিলে রেকার দিয়ে হয়রানি করা হয় নিয়মিত।
বাড়ি ফেরার পথে ট্রলির চাকায় পিষ্ট দুই কিশোর
গ্রেপ্তারের পর হাসপাতালে ছাত্রদল নেতার মৃত্যু
নিবন্ধন ফিরে পেতে জামায়াতের আপিল শুনানি আজ