রাতারাতি মার্কেট দখল

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩০ এএম

রাজধানীর গন্ডি ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার গেলেই সাভারের ফুলবাড়িয়া এলাকা। ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশেই মফিজউদ্দিন চেয়ারম্যান মার্কেট। ১৯৭২ সালে কেনা ২৩ শতাংশ জমির একপাশে এ মার্কেট তৈরি করে স্থানীয় মো. রাজীব আহম্মেদের পরিবার। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই মার্কেটে দোকানপাটের ভাড়া দেওয়া এবং জমিসংশ্লিষ্ট সব খরচ বহন করছিল তারা।

গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই জমি জবরদখল করে স্থানীয় একটি চক্র। তারা রাতারাতি ইট-বালু দিয়ে বাউন্ডারি দেয় এবং দোকানের নাম ও মার্কেটের নাম বদলে ফেলে। তারা দোকানের ভাড়া আদায় করতে গেলে বা দোকানের আশপাশে কাউকে দেখলেই হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেয়। এ ব্যাপারে থানায় ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জমির দলিল যাচাইয়ের জন্য বারবার সালিশ ডাকা হলেও দখলদাররা তারিখ দিয়েও উপস্থিত হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত ৫ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে মফিজউদ্দিন চেয়ারম্যান মার্কেট এবং জমির মালিকানা দাবি করে স্থানীয় মো. আইয়ুব আলী বাচ্চু মিয়া (৫৫), তার দুই ছেলে মো. আল-আমিন (৩২) ও মো. আজিজুলসহ (২৮) অর্ধশতাধিক লোক মার্কেটটি দখলে নেয়। সে সময় তারা ফিল্মি স্টাইলে মার্কেটের ভেতরে ভাঙচুর চালায়। কয়েকজন দোকান-মালিক বাধা দিতে গেলে তাদের ব্যাপক মারধর করা হয়। বেশ কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর চালানো ও লুটপাট করা হয়।

জমি ও মার্কেট মালিক মো. রাজিব আহম্মেদ দেশ রূপন্তরকে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে থেকেই আইয়ুব আলী এবং তার পরিবার আমার কাছে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছিল। কিন্তু আমি আমার মতোই ছিলাম। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আমাদের আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে মার্কেট দখল করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘৫২ বছর ধরে আমার পরিবার এলাকাবাসীর জ্ঞাতসারেই শান্তিপূর্ণভাবে জমির ভোগদখল করে আসছে। এত বছর কেউ কোনো দিন এ জমি বা মার্কেটের মালিকানা দাবি করেনি। কারণ তা করার সুযোগ ছিল না। আমাদের সব দলিলপত্র আছে, হোল্ডিং ট্যাক্সের কাগজ আছে। ৫ আগস্টের পর আমার মার্কেট দখল করা হয়েছে এবং দোকানদারদের মারধর করে ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে দখলদাররা। রাতারাতি ইট-বালু দিয়ে বাউন্ডারি তুলে মার্কেটের নাম বদলে ফেলেছে তারা। মারধরের ভয়ে কেউ কথা বলতে পারে না। পুলিশকে ম্যানেজ করে তারা দখলবাজি চালাচ্ছে। আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, আমি যদি মার্কেটে পা রাখি তাহলে আমার লাশ পড়বে। মীমাংসার জন্য পুলিশের কথামতো জমির কাগজপত্র নিয়ে বসার কথা থাকলেও তারা বারবার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।’

ওই মার্কেটের দোকান-মালিক মো. জিয়া বলেন, ‘৫ আগস্ট মার্কেট দখলের সময় বাধা দিতে গেলে আমাকে মারধর করা হয় এবং কিছু মালপত্র নিয়ে যায়। পরদিন আমার সব মালপত্র লুট করা হয় ও দুটি গাড়ি জ¦ালিয়ে দেওয়া হয়। অন্য দোকানদারদেরও তারা ভয় দেখিয়েছে এবং হুমকি দিয়েছে; বলেছে, এখন থেকে যেন তাদের ভাড়া দেওয়া হয়। মার্কেট এখন তাদের।’

মার্কেটের দোকানদার মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকেই এ মার্কেটের নাম মফিজউদ্দিন চেয়ারম্যান মার্কেট। ৯ বছর ধরে মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে আছি। এ জমির মালিক মো. রাজিব আহম্মেদ এবং শুরু থেকেই তাদের ভাড়া দিয়ে আসছি। এত বছর কেউ কখনো এসে দাবি করেনি যে এ মার্কেট তাদের বা এ জমি তাদের। হুট করে দখলদাররা এসে বলে, এ মার্কেটের নাম শহর আলী মার্কেট। আমাকে বলেছে দোকান থেকে মফিজউদ্দিন মার্কেট নাম মুছে যেন শহর আলী মার্কেট লিখি, না হলে আমার অবস্থা খারাপ হবে।’

আরেক দোকানদার সুভাষ সরকার বলেন, ‘আমি সাত বছর ধরে এ মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে আছি। শুরু থেকেই রাজীব ভাইকে ভাড়া দিয়ে আসছি। এখন আমাদের হুমকি দিয়ে ভাড়া নিচ্ছে আইয়ুব আলী এবং তাদের ছেলেরা।’

এসব বিষয়ে আইয়ুব আলীকে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করেন তার ছেলে আল-আমিন। তিনি দাবি করেন, ‘এ জমির মধ্যে আমাদের অংশ আছে। এ নিয়ে আমরা আদালতে মামলা করেছি।’ আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষা না করে ৫ আগস্ট কেন মার্কেট দখল করেছেন জানতে চাইলে তিনি উত্তর দেন, ‘আপনি জানতে চাইলে আপনিই অনুসন্ধান করেন।’

সাভার মডেল থানার ওসি মো. জুয়েল মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মার্কেট দখলের বিষয়টি আমার তেমন জানা নেই। তবে যদি দখল বা কোনো অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জমিসংক্রান্ত আইনে মামলা করা হলে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত