পাচারের অর্থ ফেরাতে মরিয়া সরকার

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০১ এএম

শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি লুটপাটতন্ত্রের চাপে পিষ্ট হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকা) এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতি নিয়ে তৈরি করা এক শ্বেতপত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের রাঘববোয়াল (ক্রীড়নক), আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। এই দুর্নীতিবাজরা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় এসব টাকা পাচার করে নিজেদের জন্য আয়েশের প্রাসাদ বানিয়েছে।

হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস পুরো দুনিয়ায় অত্যন্ত সম্মানিত মানুষ। বিশ্বনেতারা তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন। ফলে দেশবাসীর আশা, উনি তার সুনাম কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত আনতে পারবেন। ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) যোগ দিতে চার দিনের সরকারি সফরে গত সোমবার দাভোসে যান প্রধান উপদেষ্টা। সফরে উপদেষ্টার সঙ্গে বিশ্বনেতাদের বৈঠক হয়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিশ্বনেতাদের সহযোগিতা চান।

অধ্যাপক ইউনূস বুধবার দাভোসে ছয়টি বৈঠকে যোগ দেন। তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্মেলনের ফাঁকে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধান উপদেষ্টা ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গেও সম্মেলনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডির সঙ্গেও বৈঠক করেন। তা ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দুবাই কালচার অ্যান্ড আর্টস অথরিটির চেয়ারপারসন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের মেয়ে শেখ লতিফা বিনতে মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম এবং ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বরাতে জানা গেছে। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফ হিউসজেনও বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। রাষ্ট্রদূত হিউসজেন প্রধান উপদেষ্টাকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখ শহরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বার্ষিক নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সাক্ষাৎকালে তারা জুলাই বিপ্লব, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট এবং অনলাইনে ভুয়া তথ্য প্রচারের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

আওয়ামী সরকারের আমলে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, এটি অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘস্থায়ী কুপ্রভাব পড়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউনূস সরকার অর্থনীতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের মানুষের অন্যতম চাহিদা ছিল দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতির রাশ টেনে ধরা। মানুষ এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তারা জীবনের বিনিময়ে হলেও হাসিনা সরকারের পতন চেয়েছে। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পরও অর্থনীতির উন্নতি হয়নি। দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, পাচার হওয়া অর্থ সরকার উদ্ধার তো করতে পারেইনি, বরং আরও বেশি ভ্যাট বসিয়েছে। যার ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের জন্য এ অবস্থা আরও অস্বস্তিকর হয়েছে। ফলে প্রধান উপদেষ্টা যদি নিজের সুনাম কাজে লাগিয়ে, বিশ্বনেতাদের সহযোগিতা নিয়ে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফেরানোর উদ্যোগ নিতে পারেন, তাহলে তাতে সরকার, জনগণ ও দেশের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত