অনিয়ম আর দুর্নীতির ওপেন সিক্রেট সেন্টারে পরিণত হয়েছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। টেন্ডার ও আরএফকিউ প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কেনাকাটায় অনিয়ম নজরে নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর ও ইউজিসি। যেখানে সরাসরি সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শিবলী মাহবুব।
রাজস্ব খাতের অর্থ থেকে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করার বিধান থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি ছাড়িয়েছে কোটি টাকা। শুধু ২০১৯ সালে মো. শিবলী মাহবুব পদে থেকে কিনেছেন ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার সরঞ্জাম। এই কেনাকাটার ব্যয় নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর ও ইউজিসি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব কাজ প্রকার অনুযায়ী চারটি প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে, যেখানে দুটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে একই ব্যক্তির কাছে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আখতার ফার্নিচার থেকে আসবাবপত্র কেনে বিশ্ববিদ্যালয়টি, যেখানে টেন্ডার ওপেনিংয়ের পর আবার ৫০ হাজার টাকা মূল্য বাড়ানো হয়। যার নির্দেশনা দিয়েছিলেন মো. শিবলী মাহবুব। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘শিবলী সাহেব নিজের ইচ্ছামতো কেনাকাটা করেন। যারা কেনাকাটা করেন, তারাও এর আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখেন। আখতার ফার্নিচার ক্রয়ে বাড়তি ৫০ হাজার টাকা তিনি নিজে নিয়েছেন, যা সংগ্রহও করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধস্তন কর্মকর্তা দিয়ে। যেখানে টেন্ডার ওপেনিংয়ের পর মূল্য বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। তবে তিনি এগুলো করেছেন। ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। যারা কাজ পায়, তারা প্রত্যেকেই নির্ধারিত মূল্য থেকে ৫০-১০০ টাকা কম দেখায়। এত সূক্ষ্মভাবে মূল্য নির্ধারণ করে দেন শিবলী মাহবুব।’
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিবলী মাহবুব বলেন, ‘যা হয়েছে নিয়ম মেনেই। আমি উত্তর দিতে পারব না, আপনি কর্র্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করেন আর মূল্য বাড়ানোর বিষয় আমার জানা নেই।’
এ ছাড়া ডিজিটালাইজেশনের জন্য ৫৯ লাখ টাকা খরচ করে ধানমন্ডির এক প্রতিষ্ঠান (অউউওঊ ঝড়ভঃধিৎব ষঃফ) থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রয় করে ইএমআইএস বা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম, যা এখনো ব্যবহার করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এই সফটওয়্যার কেনার জন্য দফায় দফায় সভা করার কাগজ দেখানো হলেও বাস্তবে কোনো বৈঠক হয়নি। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করে ফাইলে সভায় অংশগ্রহণের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হতো, যা শিবলী মাহবুবের নির্দেশে ওই দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা করেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাক্ষর আনতে যাওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক আবুল ফজল মো. জয়নুল আবেদিন এবং ঢাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সে সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আইনুল হককে দফায় দফায় স্বাক্ষর এনে সম্মানীর খাম দিয়ে এসেছি। তবে বাস্তবে কোনো বৈঠক হয়নি।
এমন তথ্য জানতে চাইলে রাগে ফোন কেটে দেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শিবলী মাহবুব। তবে প্রাথমিকভাবে এমন অভিযোগ তাদের কাছেও রয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুমন কান্তি বড়ুয়া।’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের দেওয়া তথ্য সঠিক। তবে অধিকতর সত্যতা নিশ্চিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’
মো. শিবলী মাহবুব নিজেই লাভবান হতে এই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। যেখানে এক্সপার্ট হিসেবে দুজনই ছিলেন তার পরিচিত। যার একজন তার সাবেক কর্মস্থল পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং দেওয়ান আইনুল হক । তিনিও শিবলীর পূর্বপরিচিত বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
মো. শিবলী মাহবুব বছরের পর বছর এই দায়িত্ব পালন করে গড়ে তুলেছেন ঠিকাদারি সিন্ডিকেট। যেখানে তার ইশারায় নির্ধারণ হয় কাজ কে পাবে আর কে পাবে না। তার নোটবুকে নাম না থাকলে কেউ কাজ পায় না বলে জানান পরিকল্পনা দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, কীভাবে যেন দুটো প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে যায়। যার একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান একটি রহমান অ্যান্ড সন্স, আরেকটি মুন্সি এন্টারপ্রাইজ। এ ছাড়া অন্য আরও দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে একই তালিকায়, যারা ইলেকট্রনিকস ডিভাইস দিয়ে থাকে। সেখানেও একই মালিকের দুই প্রতিষ্ঠান। যার একটির নাম তাহের আইটি, অন্যটি সিডিএস আইডিবি।
মালিকানা এক ব্যক্তির কি না তা স্বীকার করেননি উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শিবলী। তবে তা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন তাহের আইটির মালিক। তিনি বলেন, ‘দুটো প্রতিষ্ঠানই আমার। একটি আমার নিজের, অন্যটিতে আমি চাকরি করি। তবে শিবলী মাহবুবের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অস্বীকার করেন।’
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শাহ আজম শান্তনুর সঙ্গে সখ্য গড়ে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তও বাগিয়ে নিতেন শিবলী। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালকের পদ ২০১৮ সালে ছাড়করণ করা হলেও, সে পদে নিয়োগ দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়। এ কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পরিচালক পদের দায়িত্বও পালন করছেন শিবলী।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন অনুযায়ী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত সব সভায় সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করার কথা পরিচালকের, তবে এই পদে লোক না থাকায় পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন সপ্তম গ্রেডের কর্মকর্তা।
ইউজিসি, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটায় আপত্তির বিপরীতে তদন্ত চলমান থাকলেও নতুন করে তদন্ত চলাকালেই ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করেন দায়িত্বে আপত্তি থাকা কর্মকর্তা পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শিবলী মাহবুব।
এমন পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ‘বেশ কিছু অনিয়মের বিষয় আমাদের নজরে এসেছে, যা নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে মনে রাখতে হবে, ইউজিসি শাস্তি দিতে পারে না। শুধু শাস্তির সুপারিশ করতে পারে। আমরা ইতিমধ্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছি এবং তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে আমরা সুপারিশ করব। যার বাস্তবায়ন বিশ্ববিদ্যালয়কেই করতে হবে।’
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে আসা রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়ে অডিট অধিদপ্তরের মন্তব্য জানতে গিয়ে দেখা যায়, চারটি ধাপে উল্লেখযোগ্য কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয় পেয়ে সেখানে আপত্তি জানিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছে। যেখানে তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপরও শিবলী মাহবুবের তত্ত্বাবধানে পুনরায় কেনাকাটার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এমন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সুমন কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা বেশি দিন হয়নি দায়িত্ব পেয়েছি। খুব দ্রুতই সমাধান করার চেষ্টা করব। পরিচালকের কাজ চালিয়ে নিতেই তাকে দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।’
টেন্ডার শিডিউলের ইস্যুকারী থেকে দপ্তর প্রধান দুই স্বাক্ষরই একজনের আর এভাবেই এক ব্যক্তির দপ্তরে পরিণত হয়েছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর।
শুধু কেনাকাটায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ-বাণিজ্যেও এগিয়ে শিবলী সিন্ডিকেট। নিজের স্ত্রী আসিফা সুলতানাকে ২০১৯ সালে ক্ষমতার ব্যবহার করে নিজ প্রতিষ্ঠানেই চাকরি দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ আয় ও সম্পদের হিসাবেও তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন মো. শিবলী মাহবুব। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা প্যানেল থেকে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা।
