দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঠিকাচুক্তি করার পরও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি বিমানবন্দরের প্রায় ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাতিল করার প্রস্তাব করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক। চলতি মাসে এসব কাজের ঠিকাচুক্তি বাতিল করে নতুনভাবে সরকার নির্ধারিত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা বাস্তবায়নের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। এসব কাজের মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দর কেন্দ্রীয় মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিমানবন্দরের স্থাপনা নির্মাণকাজ রয়েছে। এতে অন্তত ৫০ কোটি টাকা গচ্চাও যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
বেবিচক সংশ্লিষ্টরা জানায়, উন্নয়নমূলক কাজের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাধ্যবাধকতা, ডিপিডি না মানা, ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়া এবং বীমাসংক্রান্ত কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় এসব কাজ বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কুর্মিটোলার ইর্শাল কলোনিতে ১৪-তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, কাওলায় ১৪-তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, থার্ড টার্মিনালের সাউথ সাইডে স্টেকহোল্ডারদের জন্য অফিস ভবন নির্মাণ, সিএটিসি কমপ্লেক্সে নতুন মসজিদ নির্মাণ, বেবিচক হেড অফিসের ইস্ট সাইডে ছয়তলা অফিস ভবন নির্মাণ, বেবিচকের প্রশাসনিক এলাকায় সেমসুর অফিস কমপ্লেক্স, ওয়ার্কশপ ও ওয়্যারহাউজ নির্মাণ, তেজগাঁওয়ে দুটি ছয়তলা ভবন নির্মাণ, আমবাগানে নতুন মসজিদ নির্মাণ ও অন্যান্য কাজ, কুর্মিটোলায় বেবিচক কলেজের পাশে অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছয়তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে সেন্ট্রাল স্টোর, অভিযোগ সেন্টারসহ নানা অফিসের জন্য ভবন নির্মাণ, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে ১৪-তলা ভবনের ১০-তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, ছয়তলা কোয়ার্টার নির্মাণ, কক্সবাজার বিমানবন্দরে ডি টাইপ কোয়ার্টার নির্মাণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছয়তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, বাগেরহাট খানজাহান আলী বিমানবন্দরে অফিস ভবন কাম রেস্টহাউজ, কার পার্কিং, কানেকটিং এবং অভ্যন্তরীণ রাস্তা ভূমি উন্নয়ন, ড্রেনেজ সিস্টেমের নির্মাণকাজ, ওসমানী বিমানবন্দরে ১০-তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, ছয়তলা কোয়ার্টার নির্মাণ এবং কক্সবাজারে ডি টাইপ কোয়ার্টার নির্মাণকাজ রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পাওয়ায় কাজ বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ঠিকাদারের পাশাপাশি বেবিচকও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, আবার নতুন করে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হবে। আর এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে খোদ সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগ।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বিগত আর্থিক বছরে বেবিচকের নিজস্ব তহবিল থেকে এসব স্থাপনার নির্মাণ খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী বেবিচকের বর্ধিত জনবলের দাপ্তরিক, আবাসন, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষালয় প্রভৃতি সুবিধাদী সৃষ্টির প্রয়োজনে এসব কাজ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার প্রয়োজনীয়তা থাকায় দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় কিছু প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ ছাড়া এসব কাজের ডিপিপি অনুমোদন করার জন্য গেল বছর বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেয়। সেটা বাস্তবায়ন করা হয়নি। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে পরিচালন বাজেটের আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ব্যতীত নতুন ‘আবাসিক ভবন’, ‘অনাবাসিক ভবন’ এবং ‘অন্যান্য ভবন ও স্থাপনা’ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ থাকবে; তবে চলমান নির্মাণকাজ ন্যূনতম ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকলে অর্থ বিভাগের অনুমোদনক্রমে ব্যয় নির্বাহ করা যাবে, অর্থ বিভাগের এমন নির্দেশনা রয়েছে।
বেবিচকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কার্যাদেশ দেওয়া কাজগুলোতে শুধু পূর্ত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, ই/এম কাজ অন্তর্ভুক্ত নেই, ফলে কাজ বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এবং যেহেতু ডিপিপি প্রণয়ন বা অনুমোদন না করে কাজ সমূহের প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ, কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে; যা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলার পরিপন্থী এবং যেহেতু চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন বাজেটের আওতাধীনে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত কাজের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধ রয়েছে এবং ঠিকাচুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সাধারণ বীমা করপোরেশন হতে তালিকায় বর্ণিত কাজগুলোর ইন্স্যুরেন্স ডকুমেন্টস পাওয়া যায়নি এবং দপ্তরিক/আবাসিক/মসজিদ/কলেজ অ্যাকাডেমিক ভবন সংশ্লিষ্ট কাজগুলোর ক্যাপাসিটি যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পাদনের মাধ্যমে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন, সেহেতু এসব কাজের প্রশাসনিক অনুমোদন ঠিকাচুক্তি বাতিল করে নতুনভাবে সরকার নির্ধারিত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক কাজ সমূহের বাস্তবায়নের সদয় অনুমোদন দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, নতুন চিফ ইঞ্জিনিয়ার এসে অনেক কাজ প্রতিহিংসামূলকভাবে বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার অভিযোগসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঘুষের টাকা ফেরত চেয়ে একজন ঠিকাদার তার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি এবং উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন। তার পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য এসব কাজ বাতিল করতে যাচ্ছেন। দুয়েক দিনের মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
