হত্যা-আত্মহত্যায় তিন দিনে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:০৬ এএম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) এক নারী শিক্ষার্থী ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। গতকাল ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে পুরান ঢাকার কাঠেরপুলের তনুগঞ্জ লেনের একটি মেসে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের বরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানিয়েছেন, প্রেমিককে কলে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এ শিক্ষার্থী।

সাবরিনা জবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি যশোরের চৌগাছার নারায়ণপুরে। সাবরিনা যশোরের ঝিকরগাছা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. তাজাম্মুল হক বলেন, ‘মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালে যাই। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি প্রেমঘটিত কারণে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। কারণ পুলিশ জানিয়েছে, ফাঁস দেওয়ার সময় প্রেমিককে কলে রেখে আত্মহত্যা করেছে এই শিক্ষার্থী। পুলিশ তার মোবাইল ফোন জব্দ করেছে।’

সূত্রাপুর থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘সাবরিনা রহমান শাম্মী কাঠেরপুলের তনুগঞ্জ লেনের একটি ছাত্রী মেসে থাকতেন। তিনি একাই থাকতেন। পাশের রুমে অন্য ছাত্রীরা থাকত। আজ (গতকাল) ভোররাত সাড়ে ৪টায় ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ আমরা উদ্ধার করি। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে।’ গত বছর (২০২৪) সারা দেশে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে এমন চিত্র উঠে এসেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায়। এ ছাড়া গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য এক কলেজের শিক্ষার্থী ও খুলনায় তেঁতুলতলা মোড়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে গুলি করে মেরেছে কতিপয় দুষ্কৃতকারী।

পুলিশের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত এসব হত্যাকা-ের কারণ নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের এমন মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, যাপিত জীবনের হতাশা ও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ফলেই এসব মৃত্যু দেখতে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতাশার জায়গা থেকে যেসব মৃত্যু হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে পারিবারিক সৌহার্দ্য ও যোগাযোগ বেশি থাকা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।’

অর্ণব খুনের পাঁচ কারণ খুঁজছে পুলিশ : গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে খুলনা নগরীর তেঁতুলতলা মোড় এলাকায় অর্ণবকে (২৬) গুলি করে হত্যা করে অস্ত্রধারীরা। কয়েকটি মোটরসাইকেলে এসে অস্ত্রধারীরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। একটি গুলি অর্ণবের মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে বেসরকারি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় নিহতের বাবা নিতীশ কুমার সরকার বাদী হয়ে ২০-২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের মধ্যে দুজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি একজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

খুলনায় সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও পুলিশ-প্রশাসনের উদাসীনতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল নগরীর রয়েল মোড়ে এ সমাবেশ হয়। সমাবেশে বক্তারা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।

আদালত সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত গোলাম রব্বানীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাইলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১-এর বিচারক মো. রাকিবুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এ ব্যাপারে শুনানির জন্য আগামী ৯ মার্চ পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে।

সোনাডাঙ্গা থানার ওসি শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশ পাঁচ কারণ সামনে রেখে অর্ণব হত্যার তদন্ত করছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এখনো কোনো শক্ত প্রমাণ পাইনি। তবে তার বাবার ঠিকাদারি ব্যবসার দ্বন্দ্ব, অর্ণবের টিউশনি-সংক্রান্ত ঝামেলা, প্রেম, গ্যাং ও এলাকাভিত্তিক কিছু দ্বন্দ্বের বিষয়ও সামনে এসেছে।’

রাবি শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যুর দুদিন পরও মামলা হয়নি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শিমুল শিহাব নামে রাজশাহী কলেজের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। তার মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) কোনো মামলা হয়নি। তার মৃত্যুর কারণ নিয়েও মুখ খুলছে না মতিহার থানা-পুলিশ। শিহাবের মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঘটনার দিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও চিকিৎসকদের কাছে থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান দাবি করেছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় ওই তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের দায়িত্বরত চিকিৎসক সাজিদ হাফিজ বলেছেন, ‘যখন ওই ছেলেকে নিয়ে আসা হয়, তখন তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে গায়ে ধুলোবালি লেগে ছিল। ওই সময় রোগীর পালস বা বিপি কোনোটাই ছিল না। পরে তাকে আমরা রামেকে রেফার করে দিই।’

এই বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান ঘটনার দিন রাতে সাংবাদিকদের বলেন, “ক্যাম্পাস থেকে রাত ১১টার দিকে একটি ছেলেকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলে লুকানো হচ্ছিল। পরে জেরার মুখে মারামারি করে মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। তাকে ‘ফিজিক্যাল অ্যাসল্টেড ডেথ’ হিসেবে পেয়েছি। শরীরের বাইরের অংশে বড় কোনো ক্ষতের দাগ পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।”

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের মৃত্যু মূলত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ক্ষমতা ও পদ-পদবির দ্বন্দ্বের কারণে বেশি হয়ে থাকে। তার মধ্যে যেসব মৃত্যুর পরিষ্কার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেগুলোর ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো উচিত। না হলে এমন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সজাগ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত