মহামারি ও লকডাউনের পর থেকে বিশ্ব জুড়েই সিনেমা হলগুলো ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। ব্যবসা না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অনেক হল। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে, যেহেতু মানুষ আবার সিনেমা হলমুখী হয়। তবে মহামারিকালে আধিপত্য করা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এখনো ব্যবসা করছে।
হলিউড, বলিউডসহ বড় ইন্ডাস্ট্রির প্রবণতা দেখলে বোঝা যাবে, কেবল বড় তারকা ও বড় বাজেটের সিনেমাগুলোই দর্শক টানছে। সাড়া ফেলতে পারছে না মাঝারি বাজেটের সিনেমা। অনেক দর্শক হয়তো ভাবে, সিনেমা ভালো হলেও এত টাকা খরচ করে দেখার কী আছে। কিছুদিন অপেক্ষা করলেই ওটিটিতে পাওয়া যায়। আর এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের উচ্চমূল্য। অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো উপলক্ষে টিকিটের দাম কমিয়ে দিলে হলে দর্শকের ঢল নামে। তাহলে টিকিটের দাম কমলে কি বক্স অফিসের আয় বাড়বে?
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ট্রেড বিশেষজ্ঞ গিরীশ ওয়াংখেড়ে বলছেন, সিনেমার ব্যবসা টিকিটের দামের ওপর নির্ভরশীল। দাম কম হলে দর্শক সংখ্যা বাড়ে। ভারতের জাতীয় সিনেমা দিবসে মাত্র ৯৯ রুপিতে টিকিট বিক্রি হয়েছিল। তখন হলগুলো দর্শকে পরিপূর্ণ ছিল। আর এটি শুধু এক দিনের বিষয় নয়। বরং কার্যকরী কৌশল। যেমন, সোনু সুদ ও কঙ্গনা রানাউতের সিনেমা প্রথম দিনে ৯৯ রুপিতে টিকিট অফার করেছিল, যা দর্শক আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়।
ভারতে বর্তমানে মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ রুপির মধ্যে। অর্থাৎ একটি চার সদস্যের পরিবার সিনেমা দেখতে খরচ হয় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ রুপি। অবশ্য এর মধ্যে খাবার ও পানীয় রয়েছে। প্রায় একই প্রেক্ষাপট দৃশ্য বাংলাদেশেও। মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে জনপ্রতি খরচ হয় ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা। তবে খাবার ও পানীয় এর বাইরে। ফলে নতুন সিনেমা এলে দর্শকরা ভাবেন এটি দেখার মতো কি না।
বিশ্লেষক রমেশ বালার মতে, ভারতের অর্থনীতি এখনো উন্নয়নশীল পর্যায়ে। যদি হলগুলো দর্শকশূন্য থাকে তাতে সবারই ক্ষতি হয়। শুধু টিকিটের দাম নয়, খাবার ও পানীয়র দামও কমানো দরকার। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন শো টাইমের জন্য বিভিন্ন দাম নির্ধারণের পরামর্শ তার। কারণ বছরের পর বছর ধরে হলে সিনেমার দর্শক কমছে। অনেক দর্শক এখন বলে সিনেমাটি কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষার পর ওটিটিতে দেখব।
দক্ষিণ ভারতে ভিন্নচিত্র
দক্ষিণ ভারতে সিনেমার টিকিটের দাম বাড়ানোর অনুমতি নেই। সেখানে রাজ্য সরকার টিকিটের দাম নির্দিষ্ট রাখে। ফলে দর্শক বেশি হয়। রমেশ বালার মতে, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা ও অন্য দক্ষিণী রাজ্যগুলোয় টিকিটের দাম সরকার নির্ধারিত। চেন্নাইয়ের মাল্টিপ্লেক্সগুলোয় সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিত হয়, কারণ টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১৯০ রুপির মধ্যে থাকে। কম দামের কারণে হলগুলোয় দর্শক বেশি আসে, খাবার-পানীয়র বিক্রিও বাড়ে। আর শেষ পর্যন্ত এটি প্রযোজক, পরিবেশক ও হল মালিক সবার জন্যই লাভজনক।
অন্যদিকে গিরীশ ওয়াংখেড়ের ভাষ্য, উত্তর ভারতে টিকিটের দাম বাজার চাহিদার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এটি ২০০ থেকে ১ হাজার ২০০ রুপি পর্যন্ত হয়। ফলে দক্ষিণের তুলনায় সেখানে দর্শকসংখ্যা কম। আর এতে বোঝা যায়, টিকিটের দাম বক্স অফিসে পার্থক্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
টিকিটের দাম কি কমবে?
মারাঠা মন্দির সিনেমা হলের নির্বাহী পরিচালক মনোজ দেশাই বলছেন, কদিন আগে ‘পুষ্পা-২’ মুক্তির দিনে ছয়টি হলে ১৮টি শো চলেছে এবং সবগুলো হাউজফুল ছিল। আমরা টিকিটের দাম ১৩০-১৫০ রুপি রেখেছিলাম, যাতে সিনেমা হল খালি না থাকে। অন্যথায় বলিউডের বেশিরভাগ সিনেমার মতো দর্শকশূন্য থাকত।
মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ দীপেশ শাহর ভাষ্য, টিকিটের দাম কমানো সহজ। তবে এটি কার্যকর করতে যথাযথ প্রচার চালাতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকিটের দাম কমলে দর্শকরা বারবার হলে যেতে আগ্রহী হয়। এ ছাড়া টিকিটের দাম কম থাকলে দর্শকরা মাঝারি বাজেটের সিনেমাগুলোও দেখতে যায়।
অবশ্য ট্রেড বিশেষজ্ঞ রাজ ভানসালের মতে, শুধু প্রথম দিন বা বিশেষ উপলক্ষে টিকিটের দাম কমিয়ে লাভ নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদে কমানো উচিত। তবে মাল্টিপ্লেক্সগুলো দীর্ঘমেয়াদে দাম কমাতে রাজি নয়।
যা হতে পারে সমাধান
বিশেষজ্ঞ দীপেশ শাহ বলছেন, সিনেমার ধরন তারকাদের জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে টিকিটের বিভিন্ন মূল্য হতে পারে। সুপারস্টারদের সিনেমার জন্য টিকিটের দাম বেশি হতে পারে। নতুন বা কম পরিচিত অভিনেতাদের সিনেমার টিকিটের দাম কম রাখা যেতে পারে। এটি আসলে কনসার্টের মতো যেখানে জনপ্রিয় ব্যান্ডের টিকিটের দাম বেশি থাকে। তবে এটা স্পষ্ট সিনেমা হলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে টিকিটের দাম নিয়ে নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।
অবশ্য বাংলাদেশের মাল্টিপ্লেক্স ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বলছেন, টিকিটের দাম কমালে দর্শক হলমুখী হবে বিষয়টি এমন নয়। আমাদের এখানে বিদেশি সিনেমাও মুক্তি দেওয়া হয়। ভালো স্ক্রিন ও পরিবেশে সিনেমা দেখতে হলে দর্শকদের চড়া মূল্য দিতে হয়। টিকিটের দাম কমালে স্ক্রিনের মানও কমে যাবে। তবে মুক্তির পর কিছুদিন অপেক্ষা করলেই বিভিন্ন মাধ্যমে সিনেমাটি দেখার সুযোগ থাকে। তাই হল হাউজফুল হয় না। এ ছাড়া সিনেমার ওপর টিকিটের দাম ওঠা-নামা করে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে
