যৌথ বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু

বিচার চেয়েছেন যুবদল নেতা তৌহিদুলের স্ত্রী-সন্তানরা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:২৩ পিএম

কুমিল্লায় যৌথবাহিনীর হেফাজতে যুবদল নেতা মৃত্যুর ঘটনায় বিচার চেয়েছেন তৌহিদুলের স্ত্রী, চার মেয়ে ও স্বজনরা। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নিহত তৌহিদুলের গ্রামের বাড়ি সদর দক্ষিণ উপজেলার ইটাল্লায় লাশবাহী গাড়ি রেখে মানববন্ধন কর্মসূচিতে এ দাবি জানানো হয়।

পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সামনে লাশবাহী গাড়ি সামনে নিয়ে আরেকটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত চলা এই মানববন্ধনে তৌহিদুলের পরিবারের সদস্যরাসহ গ্রামবাসী অংশ নেন। এসময় তারা লাশবাহী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মানববন্ধনে নিহতের স্ত্রী ইয়াসমিন নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বিনা অপরাধে আমার স্বামীকে সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। এরপর অমানবিক নির্যাতন করে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই। আমার অবুঝ মেয়েগুলোকে যারা এতিম করেছে, তাদের বিচার চাই। 

স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, একজন ভালো মানুষকে তারা তুলে নিয়ে হত্যা করল। আমরা বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে মানববন্ধনে নিহতের ভাই সাদেকুর রহমান বলেন, গত ২৬ জানুয়ারি আমার বাবা মারা যান। মৃত্যুর খবর পেয়ে ওই দিনই চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে আসে আমার ভাই তৌহিদুল ইসলাম। শুক্রবার বাবার কুলখানি ছিল। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আমরা বাড়িতে কুলখানির আয়োজন নিয়ে কাজ করছিলাম। রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের বাড়িতে আসে। তাদের সঙ্গে পুলিশের পোশাক পরা কাউকে দেখিনি, তবে সাদাপোশাকে পাঁচজন যুবক ছিল। বাড়িতে প্রবেশ করেই তারা তৌহিদুলকে আটক করে। এরপর আমাদের সবার কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যায়। তারা আমাদের ঘরে ব্যাপক তল্লাশি করে, তবে কিছু পায়নি। আমরা বারবার জিজ্ঞাসা করি, তৌহিদুলকে কেন আটক করছেন? কিন্তু তারা কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বলে, অস্ত্র কোথায়? একপর্যায়ে তারা আমার ভাইকে বাড়ি থেকে ধরে তাদের গাড়িতে করে নিয়ে যায়। এরপর শুক্রবার সকালে আবারও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে এসে ব্যাপক তল্লাশি করে, তখনো কিছু পায়নি।

তিনি আরও বলেন, শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোরশেদ আলম আমাদের অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে কল করে জানান, তৌহিদুলের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা যেন দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসি। হাসপাতালে আসার পর দেখি, তৌহিদুল আর নেই। তাকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তার কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত এমনভাবে পিটিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে যে কালো ফোলা জখমের চিহ্ন রয়েছে। আমার ভাইয়ের পেট, বুক, পিঠ, পা, গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে শুধুই নির্যাতনের চিহ্ন।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, তৌহিদুলের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের কোনো অভিযোগ নেই। আমরা একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তর করেছি।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ সাইফুল মালিক বলেন, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে থানা-পুলিশকে বলা হয় তৌহিদুল ইসলামকে নেওয়ার জন্য। যখন পুলিশের কাছে তৌহিদুলকে হস্তান্তর করা হয়, তখন তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। তাকে কেন আটক করা হয়েছিল বা কীভাবে তিনি মারা গেছেন, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। আমরা বিষয়টির বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। আর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

উল্লেখ্য, তৌহিদুল ইসলাম কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক। তিনি একই ইউনিয়নের ইটাল্লা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে একটি শিপিং এজেন্ট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তারা চার ভাই ও তিন বোন। ভাইদের মধ্যে তৌহিদুল তৃতীয়। তৌহিদুলের সংসারে স্ত্রী ও চার মেয়ে আছে। চারজনের মধ্যে বড় মেয়ে তাসফিয়া আক্তারের বয়স ১৪ বছর, অন্যরা এখনো শিশু। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা তৌহিদুলের স্ত্রী ইয়াসমিন নাহার।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত