জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষ্যে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রায় আট ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। সকাল ১০টার দিকে তারা শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করার কিছু সময় পর মোড় অবরোধ করেন। তাদের কর্মসূচির কারণে বন্ধ হয়ে যায় শাহবাগ দিয়ে যান চলাচল। তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় আশপাশের সড়কে। বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে যানবাহনের চাপ আরও বাড়তে থাকে। যানজটের প্রভাবও পড়তে শুরু করে শহরের ভিন্ন মোড়ে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে অফিসফেরত মানুষজনকে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়। সড়কের ভোগান্তি এড়াতে অনেককে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা গেছে।
গতকাল শাহবাগ অবরোধ করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শহীদ পরিবারের সদস্যরা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছাড়া তারা অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এসএন মো. নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি আন্দোলনকারীদের জানান, প্রধান উপদেষ্টা আগামী রবিবার শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবেন। তবে তার কথায় অবরোধ থেকে সরেননি তারা। এরপর বিকেল পৌনে ৫টার দিকে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ঘটনাস্থলে আসেন এবং ঘণ্টাখানেক শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে শহীদ পরিবারের সদস্যরা অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
অবরোধ কর্মসূচিতে ছিলেন গত ১৯ জুলাই শহীদ হওয়া বরিশাল একতা ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মারুফ হোসাইনের বাবা ইদ্রিস। তিনি বলেন, ‘আমি ফুসকা-ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাই। তবুও আমি মামলা করেছি পাঁচ মাস হয়ে গেল। এতদিনেও আমার ছেলের হত্যার বিচার আমি পাইনি। কী করছে এই সরকার?’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফাঁসি দেওয়া হোক। ইউনূস সরকার যদি তা না মানে, তাহলে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিক। তিনি আমার ছেলের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন। আমার ছেলের মুখ দেখে চেনার উপায় ছিল না। আমি আমার ছেলের কবরে মাটি দিয়েছি, যেখানে আমার ছেলে আমাকে কবর দিত। এর থেকে কষ্টের কী হতে পারে? আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’
উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন রাজমিস্ত্রির কাজ করা জহিরুল ইসলাম শুভ। আন্দোলনে এসেছেন তার মা নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত। আমার ছেলেটি আমাদের চালাইতো। এখন আমাকে দেখার মতো কেউ নাই। আমার মাথা গোঁজার ঠাঁইও নাই। আমি কোথায় যাব, ঘর ভাড়া কী করে দেব, আমার জানা নাই। আমারে তো কেউ দেখতে যায়নি। আমার মাথা গোঁজার জন্য ঠাঁই দিলে অন্তত আমি বেঁচে থাকতে পারতাম।’
এদিকে গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, আসাদ গেট হয়ে ধানমণ্ডিতে যানবাহন ছিল অনেকটাই মন্থর। পান্থপথ, কলাবাগান, সায়েন্সল্যাব হয়ে শাহবাগ-নিউ মার্কেটের দিকে ছিল তীব্র যানজট। এ ছাড়া মিরপুর, গুলিস্তান, পুরান ঢাকার আরও বিভিন্ন এলাকায় যানজট দেখা গেছে।
শাহবাগে অভিমুখী ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, জ্যামের কারণে কারওয়ান বাজার থেকে হেঁটেই বাকি পথ যাচ্ছি। রাস্তা বেশি না, তাই গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রিকশায় চড়ে ধানম-ি থেকে পান্থপথ হয়ে বসুন্ধরা শপিং মলে যাচ্ছিলেন সুমিয়া আক্তার। স্কয়ার হাসপাতালে সামনে এসে তাকে বহন করা রিকশাটি যানজটে আটকে যায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বাধ্য হয়ে রিকশা থেকে নেমে হেঁটেই রওনা হন। তিনি বলেন, জরুরি কাজ আছে যার কারণে এতক্ষণ জ্যামে বসে থাকা সম্ভব নয়। তাই হেঁটেই যাচ্ছি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর তেজগাঁও বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) স্নেহাশিস কুমার দাস বলেন, বিকেলের পর থেকে রাস্তায় গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর সেটি আরও বাড়তে থাকে। শাহবাগ মোড় দীর্ঘক্ষণ অবরোধ করে রাখায় চারপাশের সড়কে চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলা মোটর, কারওয়ান বাজার, বসন্ধুরা সিটির সামনে ও তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়ির ধীরগতিও দেখা যায়।
