ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে সেই সরকারের। কেমন গেল এই ছয় মাস? দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনীতি সচল করা ও বিভিন্ন সেক্টরের সংস্কারে মনোযোগ দেয় এ সরকার। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচার শুরু, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাসহ নানা কাজে ব্যস্ত ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
এ সময়ে চাপও কম তৈরি হয়নি। একের পর এক দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন মহল। কেউ চাকরি জাতীয়করণের জন্য এবং কেউ গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে আসছে। মব জাস্টিসের ঘটনা, শিক্ষকদের পদত্যাগ, সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি প্রভৃতি ইস্যু সামাল দিতে হচ্ছে সরকারকে। ঐকমত্য ধরে রেখে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের।
২০২৫ সালের শেষে অথবা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করার কথা বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সময় ধরেই নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রোডম্যাপ স্পষ্ট না করার প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরা। দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য লাগাতার বলে যাচ্ছেন দলগুলোর নেতারা। নির্বাচন এ বছরের মাঝামাঝি জুলাই-আগস্টে সম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নির্বাচনের সময় সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা স্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক করার চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কীভাবে হবে, সে প্রশ্নও আছে। সব মিলে ঐকমত্য ধরে রেখে নির্বাচন আয়োজন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ছয় মাসেই রাজনৈতিক বিভাজন, দ্বন্দ্ব আর অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি হতে দেখা গেছে। সরকারে থেকে ছাত্রদের দল গঠনের প্রয়াস এ অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি করেছে।
বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা দলগুলোর শীর্ষনেতারা ক্রমাগত বলছেন, নতুন দলকে তারা স্বাগত জানাবেন, কিন্তু সরকারে থেকে দল গঠন করা হলে সেটা জনগণ মেনে নেবে না।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এ সরকার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। অনেকে বলছেন, অভ্যুত্থানের যে লক্ষ্য ছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত জনগণ পছন্দ করছে না।’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, গণ অধিকার পরিষদের নেতারাও সরকারের সমালোচনা করছে। জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদ দেখা দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সর্বসম্মতভাবে ঘোষণাপত্র আসবে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সমাধান এখনো হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কার ও এর সময় নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যে ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দেড় দশক ক্ষমতায় ছিল, সে ব্যবস্থার সংস্কার করতে অনেকগুলো কমিশন গঠন করে এ সরকার। তবে সংস্কারসাধন এ সরকার কতটা করতে পারবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ সংস্কারসাধনে নির্বাচন ছাড়া কোনো পথ দেখছে না বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরা। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই সংস্কার কমিশনের সুপারিশের প্রয়োগের জায়গায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন বা জনপ্রশাসন সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে।
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ ইস্যুতে বলেছেন, ‘সংস্কার সংস্কার বক্তব্য রেখে দয়া করে এ আলাপ দীর্ঘায়িত করবেন না। কারণ আপনারা আলাপ যত দীর্ঘায়িত করবেন, দেশ তত বেশি সংকটের মুখে পড়বে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য গত মঙ্গলবার প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘সংসদ নির্বাচন দিতে দেরির বিষয়ে জনগণের সামনে অন্তর্বর্তী সরকার কী যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে? এখনো সময় আছে, সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ দিন। রোডম্যাপ জনগণ যৌক্তিক মনে করলে মেনে নেবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্যরাও প্রশ্ন তুলেছেন সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে। এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘নির্বাচিত, অনির্বাচিত, সেনাশাসনÑ কোনো ফরম্যাটেই কিন্তু কেউ সংস্কারের কাজটুকু করতে পারেনি। এ সুযোগ আমরা মিস করতে চাই না।’
তবে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিচারের প্রশ্নে সরকার বা রাজনীতিকদের মধ্যে বিভেদ নেই। যদিও বিচার সম্পন্ন করা এবং নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিচারকাজের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো বিরোধ নেই, কোনো সম্পর্ক নেই। বিচার বিচারের গতিতে চলবে।’
গত ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা ছিল মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রিজার্ভ পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ। অর্থনীতি বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও মানুষের ওপর চাপ কমছে না। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘এখনো পর্যন্ত জনগণের জীবনে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গনে স্বস্তি আনার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।’
৮ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে মূল্যস্ফীতির হার এখনো ঊর্ধ্বমুখী জানিয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও দিনমজুরদের ওপর চাপ বাড়ছে। মধ্যবিত্তরাও চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো বাড়তিই আছে।’ খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার গত মাসে বলেছেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত, নিজে বাজার করে খাই। আমিও মূল্যস্ফীতির চাপে আছি।’
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে চাঁদাবাজি, মজুদদারি, অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ প্রভৃতি সামাল দিতে পারেনি সরকার। ফলে দ্রব্যমূল্য কমছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার কর্মসংস্থানের টানাপড়েন মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জনগণের ম্যান্ডেট না থাকায় একটা ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্যে অনিশ্চয়তার জায়গা থাকে যার মধ্যে প্রায় বিনিয়োগ হয় না বললেই চলে এবং এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যম ফেরানোর কাজ চলছে বলা হলেও বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অকার্যকর থাকার অভিযোগ উঠছে। ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মবোক্র্যাসি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা হচ্ছে সব মহলে। পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাকের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হলেও তাদের আচরণ ও মানসিকতার পরিবর্তনে কী করা হচ্ছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতার সংস্কৃতিকে পরিহার করে ভারসাম্য রক্ষা করাও অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত সপ্তাহে পুলিশের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘কাজে আগের মতো উদ্যমটা নেই বলতে পারেন।’ ছিনতাই, চাঁদাবাজি হওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, গত পাঁচ মাসে গণপিটুনিসহ মব জাস্টিসের ঘটনায় সারা দেশে অন্তত ৭০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। কমপক্ষে ৭৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার আগে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, নির্বাচন যত দ্রুত হবে, ততই জাতির জন্য মঙ্গল হবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসে বা মার্চের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে কী কী সংস্কার করা দরকার, সে বিষয়ে মতৈক্যে আসতে হবে। সংকট মোকাবিলায় ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল ও অন্য সামাজিক শক্তিগুলোর সঙ্গে জনগণের সম্মতি খুব জরুরি।’
