চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের লাশ ঘরের সামনে থেকে ভেসে আসছে স্বজনহারাদের কান্না, আর্তনাদ। ভেতরে স্ট্রেচারে পড়ে আছে দম্পতির নিথর দেহ। এর মধ্যেই দাঁতে দাঁত চেপে ‘কাগজপত্র’ নিয়ে লাশ বুঝে নিতে মেডিকেল পুলিশ বক্সে দৌড়াদৌড়ি করছেন স্বজন মো. ইউছুপ। ‘ময়নাতদন্তের নামে খালু আর খালার নিথর দেহে ছুরি চলুক, তা আমরা চাই না’। গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলছিলেন ইউছুপ।
এর আগে ভোর ৬টা ৪০ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম নগরের বলুয়াদিঘির পশ্চিমপাড়ে একটি কলোনির পাশের ঘরে আগুন লাগে। ওই ঘর থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরোতে দেখে প্রাণ বাঁচাতে দুই সন্তান ও এক প্রতিবেশীকে নিয়ে শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন মো. ইলিয়াছ (৫০) ও তার স্ত্রী পারভিন আকতার (৪৫)। কিন্তু ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেয় এ দম্পতি। এ ঘটনায় আহত হন তাদের দুই সন্তান শাহীনা (২৩) ও সোহান (২১) এবং প্রতিবেশী ফয়সাল নামে এক যুবক। উদ্ধারের পর চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ঠাঁই হয় এই তিনজনের। কিন্তু এখনো তারা জানেন না তাদের মা-বাবা আর এই দুনিয়াতে বেঁচে নেই। আহত তিনজনকে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বার্ন ইউনিট থেকে চমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে মেয়ে শাহীনা আর ফয়সালের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।
গতকাল সোমবার দুপুরে চমেক হাসপাতালের লাশ ঘরের সামনে গিয়ে দেখা যায়, নিহত দম্পতির ছোট মেয়ে তাহসীনা ও একাধিক স্বজন হাউমাউ করে কাঁদছেন। প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। আইসিইউর সামনে গেলে এক চিকিৎসক বলেন, ‘নিহত দম্পতির শরীরের আলামত দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা একেবারে শেষ পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন।’
সেখানে দেখা হয় নিহত পারভীনের ভাগিনা মো. ইকবালের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালা-খালু বলুয়ার দিঘির পশ্চিম পাড়ের বস্তির একটি বাসায় ৬ হাজার ৩০০ টাকায় ভাড়ায় থাকতেন। প্রতিবেশীর বেড়ার ঘরে আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে তারা শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ধোঁয়ার তীব্রতায় সেখান থেকে তারা আর বের হতে পারেননি। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তাদের উদ্ধার করে। এর মধ্যে খালা ও খালুকে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায়। খালাতো ভাইয়ের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও খালাতো বোন শাহীনা বাঁচবে কি না জানি না।’
বিকেল ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় আমজাদ হোসেন জানান, আগুন লাগার পর বেড়ার ঘরের বাসিন্দারা বের হতে সক্ষম হলেও পাশের সেমিপাকা ঘরের শৌচাগারে আটকে পড়েন বছর পঞ্চাশের মো. ইলিয়াছ, তার স্ত্রী পারভীন আকতার, তাদের দুই সন্তান শাহীনা ও সোহান এবং প্রতিবেশী ফয়সাল। শৌচাগারে ঢোকার পর তারা চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু এ সময় আগুন ও ধোঁয়ার তীব্রতায় তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করার আগেই মৃত্যুর কোলো ঢলে পড়েন ওই দম্পতি।’
সোমবার সকাল ৮টার দিকে আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর সোহান ও তার বোন শাহীনা এবং প্রতিবেশী ফয়সালকে ভর্তি করা হয় চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে। তবে আগুনের তাপ আর ধোঁয়ায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই শ্বাসনালি পুড়েছে বলে জানান বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. এস খালেদ।
স্বজনেরা জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বলুয়ার দিঘির পশ্চিম পাড়ের জাফর সওদাগরের কলোনিতে এ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। নিহত ইলিয়াছ ছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। ছেলে সোহানও একই কাজ করেন। ইলিয়াছের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছোট মেয়ে তাহসীনা বাসায় ছিলেন না। তিনি কয়েকদিন আগে কর্ণফুলী থানা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
চমেক হাসপাতালে কাঁদতে কাঁদতে নিহত ইলিয়াছের মেয়ে তাহসীনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা দুদিন আগে। সকালে আগুন লাগার খবর পাই। হাসপাতালে এসে দেখি মা আর বাবা বেঁচে নেই। আমরা এখন কাকে নিয়ে বাঁচব। মা-বাবার মৃত্যুর খবরও আমার ভাইবোন জানে না।’ নিহত ইলিয়াছের বোন পারভিন আক্তার বলেন, ‘পাশের ঘরে যখন আগুন লাগে, তখন সবাই ছিল ঘুমে। আগুনের জন্য তাদের ঘরের ভেতরে ঢোকা যাচ্ছিল না। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিভিয়ে একটা শৌচাগার থেকে পাঁচজনকে বের করে। তখন জানতে পারলাম, ভাই আর ভাবি এই পৃথিবীতে নেই।’
ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, আগুন নেভানোর পর পাঁচজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্য তিনজনকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। হতাহতদের শরীরে পোড়ার ক্ষত নেই। তবে ধোঁয়ায় তাদের শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
