মহানগরী খুলনার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের খানজাহান আলী রোডের হোল্ডিং (বাড়ি বা অন্য স্থাপনা) নম্বর-৩৩৬। আগে এই হোল্ডিংয়ে পৌরকর নির্ধারণ হয় ১ লাখ ৩২ হাজার ৮০০ টাকা। তবে ২০২৪-২৫ সালে রিভিউ বোর্ডে তদন্তের নামে সেই পৌরকর কমিয়ে নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ১৭০ টাকা। শুধু এ ঘটনাটিই নয়, পৌরকর নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণে সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশনে এমন নজির দেখা মিলছে ভূরি ভূরি। বিশেষ করে রিভিউ বোর্ড ও রিভিউ বোর্ডে পুনঃতদন্ত দেওয়া কেসগুলো তদন্তের নামে বিতর্কিত (অস্বাভাবিক হারে কম) পৌরকর নির্ধারিত হচ্ছে।
এমনকি পৌরকর হ্রাসের জন্য জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে চুক্তিপত্রের পাতাও। এ ছাড়া হোল্ডিংয়ে বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকলেও নাম পরিবর্তন করে সেই পৌরকর করা হচ্ছে অনাদায়ী। অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পকেট ভারী করতে এসব কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে করপোরেশন। যার প্রভাব পরিচালন ব্যয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে খোদ করপোরেশনেরই অন্য শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খুলনা মিউনিসিপ্যাল ১৯৮৪ সালে কপোরেশনে উন্নীত হয়। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর খুলনা পৌরসভা সৃষ্টি হয়। এরপর ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। বর্তমানে ৩১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই সিটি করপোরেশনের আয়তন ৪৫ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। এ আয়তনে হোল্ডিং রয়েছে ৭৬ হাজার ৬২৮টি। হোল্ডিংগুলোর বিপরীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৫ কোটি ৭ লাখ ১৬ হাজার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ২ লাখ ৮১ হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪২ কোটি ২৭ লাখ ৭৪ হাজার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (৬ মাসে) ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়। এ খাত থেকেই করপোরেশনের পরিচালন ব্যয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে সিংহভাগ অর্থের জোগান আসে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, গত বছর ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে সরকার পতনের পর থেকে করপোরেশনের করধার্য শাখায় যেন হরিলুট চলছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সবকিছুই চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতায়। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি অনিয়মের কথা বলা যায়। মহানগরীর স্যার ইকবাল রোডের ১০৭/১৩০ নম্বর হোল্ডিংয়ের চারতলা ভবনের পৌরকর নির্ধারণের সময় করপোরেশনে ১১টি ঘর ভাড়ার চুক্তিপত্র জমা দেন মালিক মো. ইউসুফ হারুন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো পৌরকর কমাতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে করপোরেশনের নথি থেকে ১১টি চুক্তিপত্রের সবকটির প্রথম পাতা পরিবর্তন করা হয়েছে, যা করপোরেশনের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
একইভাবে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে আগে পৌরকর নির্ধারণ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা, যা রিভিউ বোর্ডে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুনর্নির্ধারণ হয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা। একই ওয়ার্ডের ৬ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকার স্থলে চলতি অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৪/১ নম্বর হোল্ডিংয়ে বছরে পৌরকর ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা, চলতি অর্থবছরে তা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪০/৯০ নম্বর হোল্ডিংয়ে কর ছিল ৩০ হাজার ৪০০, সেটি পুনর্নির্ধারণ হয়েছে মাত্র ৪০০ টাকা। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮০/১৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে আগে কর ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার, যা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে ৯৬ হাজার টাকা। একই ওয়ার্ডের ১৭৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে বছরে পৌরকর ছিল ৭৪ হাজার ৭৬৫, সেটি কমিয়ে নির্ধারণ হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ১৩০ টাকা এবং ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের শেরেবাংলা রোডের ২৩৩ নম্বর হোল্ডিংয়ে কর ছিল ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পুনর্নির্ধারণ হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এভাবে অসংখ্য হোল্ডিংয়ের পৌরকর নিয়মবহির্ভূতভাবে কমানো হচ্ছে।
রিভিউ বোর্ডে পৌরকর হ্রাসের বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ নেই, কিন্তু ‘সিটি করপোরেশন সমূহের করবিধি ১৯৮৬’-এর ১৮ ধারায় বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তির ওপর আরোপিত কর দ্বারা ওই ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়বে এমন পরিস্থিতি উদ্ভব হলে সিটি করপোরেশন একটি সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ধার্যকৃত করের ১৫ শতাংশ হ্রাস করতে পারবে। এরূপ হ্রাস মঞ্জুর করার পর হ্রাসকৃত করের ওপর দ্বিতীয়বার কর হ্রাস করা যাবে না। তবে এ ক্ষেত্রেও আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সোনাডাঙ্গার ৪৩৭ ও ৪ নম্বর হোল্ডিং, ১৪৯ নম্বর মুজগুন্নি এবং ১০৮ নম্বর নিরালা হোল্ডিংয়ে একাধিকবার কর কমানো হয়েছে।
এমন অনিয়মে ক্ষোভ প্রকাশ করে খোদ করপোরেশনেরই বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, রিভিউ বোর্ড ও তদন্তের নামে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে বড় ধরনের উৎকোচ নিয়ে পৌরকর কমানো হচ্ছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যে করপোরেশন জুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। পৌরকর কমানোর হারই প্রমাণ করে দুর্নীতি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুলত্রুটি সংশোধনে রিভিউ হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিধান বা আইনের অপব্যবহার করে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ ব্যাপক হারে কর হ্রাস করতে গিয়ে পরিচালনা ব্যয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেটি হবে আত্মঘাতী। তাছাড়া চুক্তিপত্র জালিয়াতি করে ভাড়া কমানো গুরুতর অন্যায়। তাই সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও রিভিউ বোর্ড চেয়ারম্যান রহিমা সুলতানা বুশরা বলেন, ‘রিভিউ বোর্ডে পৌরকর যৌক্তিকভাবে কমানো হচ্ছে। তবে চুক্তিপত্র জালিয়াতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
করপোরেশনের সচিব ও রিভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান শরীফ আসিফ রহমান বলেন, ‘রিবেট ও লোনের ভিত্তিতে পৌরকর হ্রাস করা হয়েছে।’ এর বাইরে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।
