সমাধান না করে সংকট বাড়িয়েছে বিআরটিএ!

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৫৭ এএম

মিটারে সিএনজিচালিত অটোরিকশা না চালানোর দাবিতে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছেন চালকরা। এতে সড়কে দেখা দিয়েছে তীব্র যানজট। সম্প্রতি সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারের ভাড়ার হারের অতিরিক্ত আদায় করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। বিআরটিএর এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ জানিয়ে সড়ক অবরোধ করেন চালকরা। পরে চালকদের দাবির মুখে ফের সেই নির্দেশনাটি বাতিল করে বিআরটিএ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিআরটিএ থেকে ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর মালিকপক্ষকে দৈনিক ৯০০ টাকা জমা দিতে বলা হয় সিএনজিচালিত প্রত্যেক অটোরিকশার চালককে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত এ জমার বদলে মালিকরা প্রতিটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা আদায় করে থাকেন। আর একই সময়ে মিটারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রথম দুই কিলোমিটারে ৪০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ১২ টাকা। বিরতিকালের জন্য ভাড়ার হার প্রতি মিনিটে ২ টাকা। আর যেকোনো দূরত্বে যাত্রী পরিবহনে বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও ভাড়া আর বাড়েনি। ফলে এ সমস্যাগুলো সমাধান না করে বিআরটিএ নতুন করে দেওয়া নির্দেশনায় চালকরা গতকাল রাস্তাঘাট অবরোধ করেন। ফলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের কাছে নতিস্বীকার করায় পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নতুন করে যাত্রীদের জিম্মির সুযোগ করে দিল।

গতকাল সরেজমিন রাজধানীর রামপুরা, মিরপুর-১, মিরপুর-১৪, কলেজগেট, গুলশান, বনানী সড়কসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট অবরোধ করেন চালকরা। সড়ক অবরোধের কারণে এসব এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণ প্রচণ্ড ভোগান্তির শিকার হন। অনেকের গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মো. রাহাত বলেন, কদিন পরপর আন্দোলনের নামে রাস্তাঘাট অবরোধ করা হয়। গুলিস্তান থেকে মহাখালী যেতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। তবুও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছি না। পুরো রাস্তায় ব্লক হয়ে আছে।

সদরঘাট থেকে মিরপুর রুটে চলা তানজিল পরিবহনের এক চালক মো. তানভির বলেন, ‘সকাল থেকে বিকেল হয়ে যাচ্ছে, দুই ট্রিপ দিতেই সময় চলে যাচ্ছে। সকালের সিএনজির অবরোধের জন্য সেই যানজট বিকেল পর্যন্ত লেগে আছে। গাড়ি সহজে আগে বাড়ছে না।’   

এদিকে মানিক মিয়া নামের এক সিএনজিচালিত অটোচালক বলেন, ‘আমরা সিএনজি চালিয়ে কত টাকাই বা আয় করি। যদি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয় তাহলে আমরা কীভাবে দেব। আর মিটারে যে চলাচল করতে বলা হলো তার আগে ১০ বছর আগে করা মিটারের রেট আগে বাড়ানো হোক। গ্যাস, জমা এসবের সঙ্গে মিল রেখে নতুন ভাড়া করুক তাহলে আমরা মানব। এভাবে হুটহাট নির্দেশনা আমাদের মতো চালকদের মানা সম্ভব না।’

অসহায় যাত্রীদের সিএনজিচালকের হাতে তুলে দিল সরকার অভিযোগ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ  সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিটারে না চালানোর এক দফা দাবিতে রাজধানী জুড়ে তাণ্ডব চালানো সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের কাছে নতিস্বীকার করেছে পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। সংস্থাটি মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা বাতিল করে অসহায় যাত্রীদের নগর জুড়ে তাণ্ডব চালানো সিএনজিচালকদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার করে ২৬ হাজার ৯৯৬টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার রিপ্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও তার পরিবারের আশীর্বাদে বিআরটিএর কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, বিভিন্ন সমিতি এবং অটোরিকশা উত্তরা মোটরের কিছু ডিলার মিলে এক ভয়াবহ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। তারা সিএনজি অটোরিকশার রিপ্লেসমেন্ট খাত থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে। এদের একেকজন এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। এই কারণে ৩ লাখ টাকার এক-একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এখন ৩০-৩৫ লাখ টাকা। তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবার এই খাতে সরাসরি জড়িত থাকায় তৎসময়ে কেউ টুঁ-শব্দ করার সাহস পায়নি। সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আত্মগোপনে চলে গেলেও সিএনজি অটোরিকশা খাতের এই আওয়ামী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে। তাছাড়া এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কাছে বিআরটিএর নতিস্বীকার করায় বিআরটিএর মতো এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের টাকায় পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, ‘প্রথমেই বিআরটিএকে ধন্যবাদ জানাই কিছুদিন আগে করা নির্দেশনাটি বাদ দেওয়ার জন্য। তাছাড়া হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত ভালো না। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে সিএনজিচালকদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আশা করছি সিএনজিচালকদের আরও যে সমস্যা আছে সেগুলোও বিআরটিএ দ্রুত সমাধান করে ফেলবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে সিএনজির মিটার নিয়ে যে আইনটি আগে ছিল সেটি পুনরায় আবার ঘোষণা দিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। কীসের জন্য তারা এগুলো করল? একটি আইন করে আবার সেটি ভাঙা বিষয়টি খুব খারাপ। তাহলে আমাদের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা বেড়ে যাবে। এখন চালকরা একের পর এক দাবি করবে। সামনে যাত্রীদের জিম্মি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। বিআরটিএ উচিত যেকোনো সমস্যা সমাধানে আরও বেশি কৌশলী হওয়া। 

এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. ইয়াসীনকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত