পরাশক্তিগুলোর দখলদারিত্বের মনোভাব

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:১২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মসনদে এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, ক্ষমতায় আসার পর পৃথিবীর বিভিন্ন সমীকরণ পাল্টে যাবে। এরই মধ্যে ট্রাম্পের একের পর এক সিদ্ধান্ত দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়েছে। অবৈধ অভিবাসী ইস্যু থেকে শুরু করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের পদক্ষেপসহ গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল দখলের হুমকি! কৌশলগতভাবে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি অথবা ভূ-রাজনীতি যাই বলি গ্রিনল্যান্ডের একটি আলাদা মূল্যায়ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মাঝখানে অবস্থান গ্রিনল্যান্ডের। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও দ্বীপটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন ডলারে (এখনকার হিসাবে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার) গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ড্যানিশ সরকার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। ১৯৫১ সালে প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীন গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে একটি বিমান ঘাঁটি গড়তে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সর্ব-উত্তরের ঘাঁটি এটি। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পও গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই প্রস্তাব ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয়ই প্রত্যাখ্যান করে। এ নিয়ে জার্মানি ও ফ্রান্স উভয় দেশই সতর্ক করেছে। বস্তুতপক্ষে এভাবে একটি ছোট দেশকে পরাশক্তিধর একটি দেশের দখল হুমকি পৃথিবীর শান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এ রকম নীতি চলতে পারে না। আমরা পরাশক্তি দেশগুলোর কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। যদিও তাদের কাছ থেকে প্রায়ই সেই কাক্সিক্ষত আচরণ পাওয়া যায় না।

বলে নেওয়া ভালো যে, খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ডের দিকে নজর বেশ কয়েকটি দেশের। ট্রাম্প যেভাবেই হোক, গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমেরিকার ‘দখল’ চাই এই মনোভাব বিশ্ববাসীকে এবং মূলত গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান মালিকদের চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। ইতিমধ্যেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ড্যানিশ, এমনকি ইইউ পণ্যের ওপর ব্যাপক পরিমাণে শুল্ক বৃদ্ধি করেছে। ফলস্বরূপ গ্রিনল্যান্ডের ওপর কিছু ছাড় দিতে বাধ্যও হয়েছে ডেনমার্ক। আমেরিকা এবং ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার অংশ হওয়া উচিত বলে ট্রাম্প যা বোঝাতে চাচ্ছেন, সেখানে গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ কতটুকু জড়িত বা বর্তমান অবস্থাকে প্রভাবিত করবে সেটিও ভাবার বিষয়।

গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে থাকলেও, এটি আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একটি আধা স্বশাসিত দ্বীপ এটি। এটিকে ইউরোপ মহাদেশের ডেনমার্কের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গ্রিনল্যান্ডের রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড যার ৮০ শতাংশই বরফে আচ্ছাদিত। বৃহত্তম এই দ্বীপে রয়েছে, অব্যবহৃত খনিজ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। গ্রিনল্যান্ড ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি রাজস্বের ভর্তুকি ডেনমার্ক বহন করে। আয়তনের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। দ্বীপটি প্রায় ২১,৭৫,৬০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। যা ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের সমান। তবে দেশটির প্রায় ১৮,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল বরফে ঢাকা। অর্থাৎ দ্বীপটির চার ভাগের তিন ভাগই (৮০ শতাংশ) বরফে আচ্ছাদিত। গ্রিনল্যান্ডের শহরগুলো আটলান্টিক এবং আর্কটিক মহাসাগরের উপকূল ঘেঁষা। কারণ, এই অঞ্চলগুলোই (প্রায় ৩,৪১,৭০০ কিলোমিটার) কেবল বরফমুক্ত। যা নরওয়ের চেয়ে বড় এবং ডেনমার্কের দশগুণ। দেশটির উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের দূরত্ব ২৬৭০ কিলোমিটার। গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দার সংখ্যা ৫৬ হাজার। গ্রিনল্যান্ডের মূল হলো এর খনিজ সম্পদ এবং অবস্থানগত সুবিধা। গ্রিনল্যান্ডে রয়েছে সোনা, হীরা, রুবি, নিকেল, কপার ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার। ২০১০ সালে গ্রিনল্যান্ডের খনিজ কোম্পানি ‘অ্যাঞ্জেল মাইনিং’ প্রথম রতœ ভাণ্ডার নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০১৭ সালে প্রায় ৫৬টি অনুসন্ধানকারী দলকে অনুসন্ধানের অনুমোদন দেয় দেশটির সরকার। ট্রাম্পের চাওয়া বা ডেনমার্কের অধীনে থাকা যাই হোক না কেন, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ কী চায় মূলত সেটির ওপর নির্ভর করবে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ।

দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ মানুষ আমেরিকার অংশ হতে চান না। তারা যেমন আছেন, তেমনই থাকতে চান। ছয় শতাংশ মানুষ চান আমেরিকার অংশ হতে। নয় শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা এই বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ২০০৯ সালে গ্রিনল্যান্ডকে স্বায়ত্তশাসনের চরম ক্ষমতা দেওয়া হয়। বলা হয়, গণভোটের মাধ্যমে তারা স্বাধীনতার কথাও ভাবতে পারে। অর্থাৎ, ডেনমার্ক থেকে তারা আলাদা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গত ১৬ বছরে সে কাজ তারা করেনি। কারণ, ডেনমার্কের ছত্রছায়াতে থাকলেও কার্যত স্বাধীনভাবে সরকার চালায় গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন। ট্রাম্পের ঘোষণার পর গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের মানুষই ঠিক করবেন, তারা কী চান?’ যদিও গ্রিনল্যান্ডে এমন এক ধরনের সাধারণ ঐকমত্য রয়েছে যে, স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত ঘটবে এবং গ্রিনল্যান্ড যদি স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়, তাহলে ডেনমার্ক তা মানবে এবং অনুমোদনও করবে। এটি অনেক পরের ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতা চলছে চীন এবং রাশিয়ার। যোগাযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের জন্য দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন। ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত এক দশকে এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। আর্কটিক কাউন্সিলের মতে, জাহাজের চলাচল এতটা বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ বরফ গলে যাওয়া। প্রয়োজনীয়তার দোহাই দিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ বা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতি সম্ভবত বেশি আগ্রহ হবে ট্রাম্প প্রশাসনের। আর বিকল্প হচ্ছে, সামরিক অভিযান। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো যে, এই ছোট্ট দ্বীপটিতে সামরিক অভিযান চালালে তা আরেকটি বড় সমস্যার জন্ম দিতে পারে। রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানে সমস্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই সমস্যা হতে পারে এর থেকেও গভীর। এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি।

দখলের প্রথা চালু হলে আরও অনেক দেশ এমন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধ করার মতো অবস্থা থাকবে না। এটা হবে খুবই বাজে নজির। পৃথিবী থেকে উপনিবেশবাদ দূর হলেও, প্রকৃতপক্ষে সেটির ছায়া এখনো রয়েছে। পরাশক্তিগুলোর মানসিকতার দিকে তাকালেই সেটি স্পষ্ট হওয়া যায়। গ্রিনল্যান্ড দখল হলে তারপর যেসব ঘটনা ঘটবে, তখন কেবল একটি কথাই যুক্তরাষ্ট্রকে শুনতে হতে পারে। সেটি হলো আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও! এই ধরনের কথা এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে আলোচিত হতে শুরু করেছে। মজার বিষয় হলো, পরাশক্তিগুলোর দখলদারিত্বের মনোভাব যে দেশে রয়েছে, তারাই হর্তা-কর্তা-বিধাতা। কার কথা, কে শোনে?

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত