রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসানের চেষ্টা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যতম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোনো মিল নেই। রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের পর থেকে কিয়েভকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছিল ওয়াশিংটন। তবে সেই নীতিতে পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। ইউক্রেনকে বিপুল সহায়তার বিনিময়ে ট্রাম্পের নজর পড়েছে দেশটির বিরল খনিজসম্পদ খাতে। আর দুই দেশ এই খনিজ চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ওলহা স্টেফানিশিনা।
খনিজসম্পদ চুক্তি : তিন বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে বেশ তৎপর ট্রাম্প। আর এর পেছনে রয়েছে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। এ সময় ধরে ইউক্রেনকে দিয়ে আসা সহায়তারও ঘোর বিরোধী ট্রাম্প। ফলে কিয়েভকে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে নানা ধরনের কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে ইউক্রেনও জানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া এই যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভবপর হবে না। ফলে এই মুহূর্তে পশ্চিমা সহায়তা বিষয়ে অনেকটাই পশ্চাৎপদ অবস্থায় আছে কিয়েভ।
যুদ্ধে নিজেদের সহায়তার বিপরীতে ইউক্রেনের বিপুল খনিজসম্পদের দাবি করেছেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও খনিজ, যেমন লিথিয়াম ও টাইটানিয়ামের পাশাপাশি প্রচুর কয়লা, গ্যাস, তেল ও ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে। তবে শুরুতে জেলেনস্কি ট্রাম্পের খনিজসম্পদবিষয়ক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপট পুরোপুরি ভিন্ন। সোমবার ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ওলহা স্টেফানিশিনা জানান, চুক্তির খসড়া নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে খুবই গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। চুক্তিটির গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খুঁটিনাটি বিষয় চূড়ান্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেনের নেতারা শিগগিরই চুক্তিটি অনুমোদন এবং স্বাক্ষর করতে পারেন।’
তবে বিবিসি জানিয়েছে, এ চুক্তি অনুযায়ী কী কী খনিজ দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রই বা সাহায্য কতটুকু বহাল রাখবে আর ইউক্রেনের জন্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তাটাই বা কেমন হবেতার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এই চুক্তিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার তিন বছরের যুদ্ধ অবসানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা বজায় রাখার বিনিময়ে দেশটির খনিজসম্পদ চায়। জেলেনস্কি এই চুক্তি বিষয়ে নিজের অবস্থান বদলানোর পর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সুর বদলেছেন ট্রাম্পও। কিছুদিন আগে এই যুদ্ধের জন্য সরাসরি কিয়েভকে দায়ী করছিলেন। তবে সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের আক্রমণের নির্দেশের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। তবে সোমবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘে উপস্থাপিত বেশ কয়েকটি প্রস্তাবে রাশিয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প-মাখোঁ বৈঠক : ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। সোমবার সকালে হোয়াইট হাউজে জি৭ নেতাদের সঙ্গে একটি ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন ট্রাম্প ও মাখোঁ। পরে দুপুরে ইউক্রেন যুদ্ধসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে উভয় নেতার মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মাখোঁ বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানোর অর্থ ইউক্রেনের আত্মসমর্পণ নয়। সেই সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে আবার যোগাযোগ শুরু করার পেছনে ট্রাম্পের যৌক্তিক কারণ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ইউক্রেনে ইউরোপীয় দেশগুলোর শান্তিরক্ষী পাঠানোর যেকোনো উদ্যোগ ওয়াশিংটনের সমর্থন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন মাখোঁ।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইউরোপের সঙ্গে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে মাখোঁ বলেন, নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক ভাঙনের আশঙ্কার মধ্যেই সামনে এগোনোর পথ দেখিয়েছে এই বৈঠক। সম্প্রতি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ইউরোপের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি বছর শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তার এ আহ্বানের ধারাবাহিকতায় এবং রাশিয়ার অবস্থানের প্রতি ট্রাম্পের ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে ট্রাম্প-মাখোঁ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো।
ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ : ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা ফের বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ইউক্রেনের ন্যাটোতে প্রবেশ এবং বাধ্যতামূলক আর্টিকেল ফাইভের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের যুক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
