দেশের প্রয়োজনে বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব, বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের প্রতিটি সদস্য তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করবে। দেশের যেকোনো প্রয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রয়োজনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহী সেনানিবাসের ‘রেজিমেন্ট অব দ্য মিলিনিয়াম’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারে সপ্তম ‘কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট’-এর অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এর মধ্য দিয়ে সেনাপ্রধান বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করলেন।
রেজিমেন্টের সপ্তম কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করার জন্য সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম পদাতিক রেজিমেন্টের সপ্তম কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট হিসেবে আমাকে নির্বাচিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা লাভের পর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কঠোর পরিশ্রম, সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং দেশপ্রেমের দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আসীন হয়েছে। এই রেজিমেন্ট কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে জাতীয় পতাকা লাভের দুর্লভ সম্মানে ভূষিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীনতা যুদ্ধ ও যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের পাঁচজন বীরবিক্রম ও ২৭ জন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত সেনাসদস্যকে। এ ছাড়া এই রেজিমেন্টের ৬০ জন অন্যান্য সদস্য গভীর দেশপ্রেম ও অসীম বীরত্বের সঙ্গে দেশের জন্য নিজেদের জীবন বিসর্জন করেছেন। আমি সব শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আপনারা সবাই অবগত আছেন, একনিষ্ঠ উদ্যোগের ফলে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এর মধ্যে নতুন নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠা, আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি সংযোজনসহ উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আমি কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের আভিযানিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ উপযুক্ততা বৃদ্ধির চলমান প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করব ইনশাল্লাহ। যুগোপযোগী ও আধুনিক প্রযুক্তির যেকোনো প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র এবং সরঞ্জাম জোগান দেওয়ার ব্যাপারে আমি সর্বদা সচেষ্ট থাকব।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘কর্নেল অব দ্য রেজিমেন্ট হিসেবে আমি বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের প্রত্যেকটি সদস্যকে পেশাদার ও সুপ্রশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বদা বদ্ধপরিকর। পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি একটি সুন্দর জীবনমানও আমাদের সবার কাম্য। আমি যেকোনো কল্যাণমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকব ইনশাআল্লাহ। এ ব্যাপারে আমি রেজিমেন্টের সব সদস্যের সহযোগিতা কামনা করছি।’
এর আগে সেনাবাহিনী প্রধান অনুষ্ঠানে পৌঁছালে তাকে সামরিক রীতি অনুযায়ী অভিবাদন জানানো হয় এবং ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। এরপর বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের জ্যেষ্ঠতম অধিনায়ক এবং জ্যেষ্ঠতম মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার সেনাপ্রধানকে ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের ‘কর্নেল র্যাংক ব্যাজ’ পরিয়ে দেন। এর মধ্য দিয়ে সেনাপ্রধান ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা, অন্যান্য অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার, অন্যান্য পদবির সেনাসদস্য এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সিনহা স্মরণে স্মৃতিফলক উন্মোচন : কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক উন্মোচন করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গতকাল বিকেলে টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর চেকপোস্ট এলাকায় এ স্মৃতিফলক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, সিনহার মা ও বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসসহ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবের সিনিয়র কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান সেনাপ্রধান। সেই সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের যথাযথ আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার নিশ্চিতকল্পে সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার করেন তিনি।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত ৯টার দিকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা। এ ঘটনা দেশ জুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ২৬ জুলাই ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ এরশাদ খান অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব ছিলেন। সিনহা ২১ জুলাই ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৫১তম বিএমএ লং কোর্সে যোগদান করেন। পরে ২২ ডিসেম্বর ২০০৪ সালে কমিশন লাভ করেন। তিনি একজন দক্ষ যোদ্ধা এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সদস্য ছিলেন। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইভরি কোস্টে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
