অগভীর নৌপথে গভীর সংকটে বন্দর

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:২০ এএম

উত্তরবঙ্গে কৃষি উপকরণ ও জ্বালানি সরবরাহের একসময়কার প্রাণকেন্দ্র সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী নদীবন্দর এখন নাব্য সংকট ও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আশির দশকে নির্মিত নদীবন্দরটিতে প্রথম কয়েক দশক সার, তেল, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্যবোঝাই কার্গো জাহাজের ভিড়ে সরগরম থাকলেও এখন নাব্যের অভাবে শুষ্ক মৌসুমে মালবাহী জাহাজগুলো ভিড়তে পারে না। বছর বছর খনন করেও সচল রাখা যাচ্ছে না চট্টগ্রাম-বাঘাবাড়ী নৌরুট। চট্টগ্রাম থেকে আসা জাহাজগুলো এখন যশোরের নওয়াপাড়া বন্দরে পণ্য খালাস করে। সেখান থেকে সড়কপথে কৃষি উপকরণ পরিবহন করা হয় উত্তরাঞ্চলে। এতে করে একদিকে যেমন খরচ বাড়ছে তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়কও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত না হওয়ায় প্রয়োজন অনুপাতে খননও করতে পারছে না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। মাঝে একাধিক দফায় বন্দরটির উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। নদীবন্দরটিরও একবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

বাঘাবাড়ী নদীবন্দরে প্রতিদিন মোংলা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন নৌবন্দর থেকে সার, কয়লা, পাথর, সিমেন্ট, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে এ বন্দরে নৌযান আসে। তবে শুষ্ক মৌসুমে চরম নাব্য-সংকটে পড়ে বন্দরটি। এবারও দেখা দিয়েছে নাব্য-সংকট। এ কারণে বড় বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে আসতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার ১৪টি বাফার গুদামে আপদকালীন ইউরিয়া সার মজুদ ও পেট্রোল-ডিজেল সঠিক সময়ে সরবরাহে বিঘেœর আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। অন্যদিকে বিকল্প উপায়ে সার ও জ্বালানি তেল পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক যুগ ধরে নদীর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ নৌরুটটিতে বড় পণ্যবাহী জাহাজ চলতে পারে না। ফলে তাদের পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে গেছে।

বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দরটি দ্বিতীয় শ্রেণির হওয়ায় ৭ থেকে ৮ ফুটের ড্রাফটের বেশি গভীর ড্রেজিং করা যায় না। ফলে বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে না। এ বন্দরটি সচল রাখতে এ রুটে ১০ থেকে ১২ ফুট পানির ড্রাফট প্রয়োজন। এ পরিমাণ পানির ড্রাফট নিশ্চিত করতে বন্দরটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করতে হবে। গত তিন বছর আগে এটিকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করা হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

বাঘাবাড়ী নদীবন্দর শ্রমিক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, একসময় এ বন্দরে ৫০০-৬০০ শ্রমিক নিয়মিত কাজ করতেন। এখন এখানে কাজ না থাকায় অনেকে বন্দর ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এখন ১০০-১৫০ শ্রমিক কাজ করেন। যারা আছেন তাদের কাজ না থাকায় তারাও এ পেশা ছাড়তে চাইছেন।

মোংলা থেকে বন্দরে আসা সিমেন্টবাহী জাহাজের সুকানি আবদুল আলিম বলেন, ‘বাঘাবাড়ী বন্দরের যে নৌ চ্যানেল রয়েছে সেখানে পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরে আনা যায় না। দূর থেকে ছোট জাহাজে করে পণ্য আনতে হয়। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া জাহাজ চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।’

বাঘাবাড়ী বাফার গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল আনসারী জানান, বর্তমানে সার আনা হচ্ছে নওয়াপাড়া বন্দর থেকে। তবে সেগুলোও সময়মতো পৌঁছায় না। বিপিসির বাঘাবাড়ী অয়েল

ডিপোর যমুনা ওয়েল কোংয়ের ব্যবস্থাপক আবুল ফজল মো. সাদেকিন বলেন, স্বাভাবিক সময়ে তেলবাহী জাহাজগুলো অন্তত ১০-১২ লাখ লিটার তেল পরিবহন করে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীপথে ৮ থেকে ৯ লাখ লিটার তেল পরিবহন করতে হচ্ছে। বড়াল নদীর চ্যানেলটি উন্নীত করা হলে পূর্ণ লোডে জাহাজ এ বন্দরে খালাস করা সম্ভব হবে।

বাঘাবাড়ী নৌযান লেবার অ্যাসোসিয়েশনের শাখার যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব মাস্টার জানান, উত্তরাঞ্চলের চাহিদার ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও রাসায়নিক সার বাঘাবাড়ী নৌবন্দর দিয়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আবার উত্তরাঞ্চল থেকে বাঘাবাড়ী বন্দরের মাধ্যমে চাল, গমসহ অন্যান্য পণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এ নৌপথের বিভিন্ন স্থানে নাব্য-সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যে কারণে বড় জাহাজগুলো সরাসরি বাঘাবাড়ী বন্দরে ভিড়তে পারছে না।

বাঘাবাড়ী বন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএ’র উপসহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, বাঘাবাড়ী-আরিচা নৌপথটি দ্বিতীয় শ্রেণির হওয়ায় এ রুটে ৭ ফুট পানি ড্রাফটের জাহাজ চলাচল করতে পারবে। বর্তমান এ পথে সাড়ে ৯ ফুট পানি রয়েছে। জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা কখনো কখনো বড় জাহাজে অতিরিক্ত মালপত্র নিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরে আসতে চান। বড় জাহাজ চলাচল করে প্রথম শ্রেণির নৌরুটে। দ্বিতীয় শ্রেণির নৌরুটে প্রথম শ্রেণির জাহাজ আসতে পারে না।

তিনি জানান, এ বন্দরটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণির। এ বন্দরটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করতে একটি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত