সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। দিনদুপুরে ঘটছে নানা রকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ছে ছিনতাইয়ের খবর। মানুষ সবখানে অনিরাপদ। ভয় আর আতঙ্ক বিরাজ করছে সব জায়গায়। রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপত্তা পাচ্ছে না। ভয়ে থাকে কখন জানি কী হয়ে যায়। কে আবার দরজা বা জানালার গ্রিল ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায়! এ রকম একটা অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে কাটছে মানুষের জীবন, বিশেষ করে ঢাকায় যারা বসবাস করেন। ছিনতাই ঘৃণ্য অপরাধ, কবিরা গুনাহ।
অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হস্তগত করার একটি উপায় হলো ছিনতাই, যা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরো না এবং এ উদ্দেশে বিচারকের কাছে এমন কোনো মামলা কোরো না যে মানুষের সম্পদ থেকে কোনো অংশ জেনেশুনে গ্রাস করার গুনাহে লিপ্ত হবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৮) হাদিসে এই কাজের আরও ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ১৯টি কাজ নিষেধ করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো ছিনতাই করা। (মিশকাত)
কঠোর হুঁশিয়ারি : কোনো মুমিন ও বিবেকবান ব্যক্তি ছিনতাইয়ের কাজে লিপ্ত হতে পারে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোনো মদ্যপায়ী মুমিন অবস্থায় মদপান করে না। কোনো চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না। কোনো লুটতরাজকারী মুমিন অবস্থায় লুটতরাজ করে না...। (সহিহ বুখারি) উল্লিখিত কাজগুলো ইমান পরিপন্থী। কেউ যখন এসব কাজে লিপ্ত হয় তখন সে পরিপূর্ণ মুমিন থাকে না। তার অন্তরে ইমানের নুর থাকে না। এখানে এটা উদ্দেশ্য নয় যে সে কাফের হয়ে যাবে। কাফের না হয়ে গেলেও এগুলো যে জঘন্যতম অপরাধ তা এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়।
ইসলামের নির্দেশনা : ইসলাম নীতি ও নৈতিকতার ধর্ম। এখানে অপরাধের কোনো সুযোগ নেই। ছিনতাই প্রতিরোধে আইন ও শাস্তির বিধানের সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইসলাম, যা ছিনতাই রোধ করে ইনসাফপূর্ণ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার পথ দেখায়। সেগুলো উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করা : আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করার দ্বারা অপরাধ দমন করা যায়। কারণ দুনিয়ায় অপরাধের শাস্তি হোক বা না হোক, আখেরাতে সব অপরাধের বিচার হবে। দুনিয়ায় মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আখেরাতে আল্লাহর দরবারে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না; বরং সব কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো বিষয়ে ব্যক্তি বা জাতির হক আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে সেটার জবাবদিহি করতে হবে এবং পরিণামে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৬৫) আল্লাহর সামনে হিসাব দিতে হবে, এই মানসিকতা জনসাধারণের মধ্যে সৃষ্টি হলে ছিনতাই ও অপরাধ কমে আসবে।
হালাল-হারাম সম্পর্কে অবগত করা : সর্বপ্রকার অপরাধ দমনের মূলনীতি হিসেবে ইসলাম হালাল-হারাম তথা পবিত্র-অপবিত্রের মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছে। বৈধ ও অবৈধের প্রভেদ পরিষ্কার করেছে। যা মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে পবিত্র, তা হালাল ও বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর যা অপবিত্র, তা হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে হালালের কল্যাণ ও উপকারিতা এবং হারামের অপকারিতা ও ক্ষতি স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা কোরো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সুরা নিসা, আয়াত ২৯)
হারাম উপার্জনের প্রতি নিরুৎসাহ করা : অসৎ ও হারাম উপায়ে উপার্জনের প্রবণতা থেকেই মূলত মানুষ ছিনতাইকারী হয়, যা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বপ্রকার ক্ষতির মুখোমুখি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হারাম উপার্জনের প্রতি উম্মতকে নিরুৎসাহিত করেছেন। এ ব্যাপারে আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হারাম দ্বারা বর্ধিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মিশকাত)
পরকালের পুরস্কারের ঘোষণা করা : সততা ও হালাল জীবনযাপনের ফলে ইহকালীন ও পরকালীন পুরস্কারের ঘোষণার মাধ্যমেও ইসলাম ছিনতাই দমনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ একজন মানুষের মধ্যে যখন কিছু পাওয়ার আশা থাকবে এবং সে তা পাবে, তখন সে এর জন্য কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকবে। অনৈতিক ও অবৈধ কাজে জড়িত হবে না। কারণ যারা নেক আমল করে তাদের জন্য প্রতিদান আছে। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে পুরুষ বা নারী ইমানের সঙ্গে নেক আমল করে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সেখানে তাদের বেহিসাবে রিজিক দেওয়া হবে।’ (সুরা মুমিন, আয়াত ৪০)
কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া : ছিনতাই নির্মূল করতে হলে প্রথমেই সমাজ থেকে তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সমাজ থেকে ছিনতাই প্রতিরোধে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিনতাইকারীকে মুসলিমদের দল থেকে বের করে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ ছিনতাই করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (আবু দাউদ)
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : ছিনতাই প্রতিরোধের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা। বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত রাখতে পারলেই ছিনতাই অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মাখজুম গোত্রের এক নারী চোরের ঘটনা কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলে। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল, এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারবে? তারা বলল, একমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম উসামা বিন জায়েদ (রা.) এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলেন। রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনকারীর সাজা মওকুফের সুপারিশ করছ? অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) দাঁড়িয়ে খুতবায় বলেন, তোমাদের আগের জাতিগুলোকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত। অন্যদিকে যখন কোনো অসহায় গরিব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার ওপর হদ জারি করত। আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা চুরি করত তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম। (সহিহ বুখারি)
সমাজের সবার সচেতন থাকা : নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমেও ছিনতাই দমনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসলাম। সমাজের সর্বস্তরে ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সাধারণ জনগণও এর আওতাভুক্ত থাকবে। কোথাও ছিনতাই হতে দেখলে সাধ্যমতো প্রতিবাদ করতে হবে। সবাই মিলে ছিনতাইকারীকে ধরতে হবে। কারণ আজ আমার ভাই আক্রান্ত হয়েছে, আগামীকাল আমিও আক্রান্ত হতে পারি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন সম্ভব হলে তা হাত দিয়ে রুখে দেয়। আর তা সম্ভব না হলে প্রতিবাদী ভাষা দিয়ে যেন তা প্রতিহত করে। আর তাও না পারলে সে যেন ওই অপকর্মকে হৃদয় দিয়ে বন্ধ করার পরিকল্পনা করে (মনে মনে ঘৃণা করে), এটি দুর্বল ইমানের পরিচায়ক। (তিরমিজি)
