সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমি মহাপরিচালকের (ডিজি) দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি দোষারোপ এবং ডিজির পদত্যাগে সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা।
ঘটনার সূত্রপাত শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদের আকস্মিক পদত্যাগে। তিনি আর্থিকসহ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিষয়টি নিয়ে গতকাল সোমবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রশাসনের উচ্চস্তর বিবৃতকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সরকারের অর্থব্যয়ের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পরিষ্কার করে ভাষ্য দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগতভাবে কিছু বলার নেই, যা বলার, মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে।’
সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ‘অযাচিত হস্তেক্ষেপের অভিযোগ’ এনে গত শুক্রবার একাডেমির মহাপরিচালকের পদ থেকে নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষণ বিভাগের আয়োজনে শুক্রবার ‘মুনীর চৌধুরী প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসব’র সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার একপর্যায়ে একাডেমির সচিব মোহম্মদ ওয়ারেছ হোসেনের কাছে পদত্যাগপত্র তুলে দেন তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সচিব পদমর্যাদায় মহাপরিচালক পদে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় নাট্যনির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদকে। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।
মন্ত্রী বা উপদেষ্টার সঙ্গে সংস্থা প্রদানের এই দ্বন্দ্ব প্রশাসনে কী রকম প্রভাব ফেলতে পারে জানতে চাইলে সরকারের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, ‘এটি একটি অগুরুত্বপূর্ণ নজিরবিহীন ঘটনা। দেশের বহু জরুরি করণীয় রেখে এমন অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ কোনো অর্থেই গুরুত্ব বহন করে না।’
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার বিবৃতি দিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণে একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠানের মধ্যে বক্তব্য দেওয়ার মধ্যে শিল্পকলা একাডেমির সচিবের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দাখিল করা পদত্যাগপত্রে তিনি কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও পরে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কিছু কারণ উল্লেখ করেন। তার উল্লিখিত কারণগুলোর মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের প্রতি কিছু অসত্য, বিভ্রান্তিকর তথ্যসহ সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার বিষয়ে অসত্য, মনগড়া ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য রয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক বয়ান রচনা এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনমুক্ত নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ কর্তৃক উত্থাপিত অসত্য অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
একটি ভিডিও নির্মাণের বিষয়ে চিঠিপত্র ছাড়া টাকা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের বক্তব্য বা অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য ও বানানো উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বলা হয়, ‘গত ২০-২১ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে ইউনেসকো সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ২৫ বছর পূর্তিতে অনুষ্ঠান হয়। আমন্ত্রিত হয়ে ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে। সেখানে মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশের অবদান তুলে ধরে বিশেষভাবে নির্মিত একটি ১৫ মিনিটের ভিডিও এবং একটি লাইভ প্রোগ্রাম উপস্থাপন করা হয়। ভিডিওটি নির্মাণের জন্য গত ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে একটি পত্র পাঠানো হয়। পত্রের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে মন্ত্রণালয়ের ৩৮ কোডের ‘সাংস্কৃতিক মঞ্জুরি-৩৮২১১১৫’ খাত থেকে বর্ণিত খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে। উন্নত কারিগরি সহায়তা এবং সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে ভিডিওটি নির্মাণের জন্য নিয়ম অনুযায়ী অগ্রিম কিছু অর্থ নির্মাতাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক সম্পূর্ণ অসৌজন্যমূলক আচরণ করে বাজেট বরাদ্দ না দিলে অর্থ দেওয়া হবে না বলে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার অনুরোধ নাকচ করেন। অথচ মহাপরিচালক এর আগে সাধুমেলা আয়োজনের জন্য শুধু উপদেষ্টার মৌখিক কথায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকার প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।’
ইউনেসকোর প্রোগ্রাম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের জন্য উপদেষ্টা, ইউনেসকো সদর দপ্তর, বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভিডিও নির্মাতা, শিল্পকলা একাডেমিকে সংযুক্ত করে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক অসৌজন্যমূলকভাবে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যান।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে বলা হয়, ‘শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এমনভাবে বিষয়টির অবতারণা করেছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে উপদেষ্টা তার ব্যক্তিগত কাজের জন্য কোনো অনৈতিক টাকা দাবি করেছেন। বাংলাদেশের সম্মান বিশ^দরবারে তুলে ধরার জন্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা, শত শত শহীদের কথা ইউনেসকো সদর দপ্তরে উপস্থাপন করার জন্য যেখানে শিল্পকলা একাডেমির আরও সক্রিয় হওয়ার কথা, সেখানে শিল্পকলার মহাপরিচালকের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণ ও মিথ্যাচার জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪-এর শহীদদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।’
সৈয়দ জামিল আহমেদ পদত্যাগ করার সময় বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে এখন ৭০ বছর। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জন্য আমি যে কাজ করেছি, এখন আর মন্ত্রণালয়ে দশবার করে লড়াই করে তাদের হাত-পা ধরার আমার কোনো দরকার নেই।’ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ যেমন চেয়েছিলেন ‘১৬৫ কোটি টাকা’, সেটা দেওয়া হয়নি। বরং, যারা বরাদ্দের সঙ্গে থাকেন তারা ‘মনে করে এটা তাদের নিজের টাকা, এভাবে টাকাটা বণ্টন করা শুরু করেছে তারা।’
তিনি তখন আরও বলেন, ‘আমাদের যেন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ হয়, তার জন্য সবার আগে দরকার এই মন্ত্রণালয়ে যত ধরনের কর্মচারী আছেন, তারা একটু বুঝুক যে এখানে একটা গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী জায়গায় আমরা কাজ করছি।’
এদিকে, সৈয়দ জামিল আহমেদের পদত্যাগ ও অভিযোগের বিষয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ভালো শিল্পী হওয়া আর আমলাতন্ত্রকে কনফিডেন্সে নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো দুটি দুরকম আর্ট।’
‘দ্বিতীয় কাজটা করার জন্য লাগে ধৈর্য এবং ম্যানেজারিয়াল ক্যাপাসিটি,’ তিনি যোগ করেন।
ফারুকী আরও বলেন, ‘কলিগদের বুলিং না করে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা দিয়ে অনেক কাজ আদায় করে নেওয়া যায়। পাশাপাশি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে যে কম্পোজার লাগে, সেটার সঙ্গে কোনো একটা থিয়েটার দলে নির্দেশনা দেওয়ার টেম্পারামেন্ট এক না। আমার ফিল্ম ইউনিটে আমি যা করতে পারি, একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানে তা করতে পারি না।’
‘শুধু এইটুকু আপাতত বলে রাখি, ওনার বলা অনেকগুলা কথা পুরো সত্য নয়, অনেকগুলা কথা ডাহা মিথ্যা এবং কিছু কথা পরিস্থিতি ডিল না করতে পারা-জনিত হতাশা থেকে বের হয়ে আসা বলে মনে হচ্ছে। আমার বিস্তারিত লেখা হয়তো ওনাকে বিব্রত করতে পারে। কিন্তু আমাকে আপনি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে আমাকে বিব্রতকর হলেও সত্য বলতে হবে, জামিল ভাই।’
ফারুকী লিখেছেন, ‘আমি জামিল ভাইয়ের নাটকীয় পদত্যাগ নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। কারণ, তাতে আমাকে এমন কিছু উদাহরণ টানতে হবে, যেটা তার জন্য অস্বস্তিকর হবে। আমি চাচ্ছিলাম না, কারণ আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ফর রেকর্ডস আমাকে আসলে এগুলো বলতেই হবে। আজকে আমাদের অনেকগুলা কাজ আছে। এটা শেষ করে সময় পেলে লিখব।’
