আশির দশক থেকে কুষ্টিয়ার এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম কাজল মাজমাদার। খুন-অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হাট-ঘাট নিয়ন্ত্রণ করে কুষ্টিয়ায় আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন কাজল মাজমাদার। ওয়ান-ইলেভেনের পরে আত্মগোপনে থেকে কুষ্টিয়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও গত ৫ আগস্টের পরে প্রকাশ্যে এসে কুষ্টিয়ায় আবার অপরাধের ‘মজমা’ জমিয়েছেন কাজল মাজমাদার। জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক কাজল গত দেড় দশক আত্মগোপনে থাকলেও এখন বিএনপির পদ-পদবি পেতেও উঠেপড়ে লেগেছেন।
সম্প্রতি ঘোষিত বিএনপির কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিকে বিতর্কিত করার জন্য কাজল উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতারা। কাজল মাজমাদারকে আলটিমেটাম দিলেও তিনি কারও কথা শোনেননি। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় কুষ্টিয়া থেকে পালিয়ে যান কাজল। আত্মগোপনে থেকেই কুষ্টিয়ার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে চাঁদা আদায় করতেন। আত্মগোপনে থেকে কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তার অপরাধমূলক কার্যক্রম চালাতে থাকেন। তবে কাজলের ভয়ে কুষ্টিয়ার কোনো মানুষই প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কুষ্টিয়ায় ফেরেন কাজল। তিনি ও তার অনুগতরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেন। কাজল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হয়ে কাজ করছেন তার ভাই নাহিদ মাজমাদার এবং থার্ড ইন কমান্ড শালা কল্লোল।
৫ আগস্টের পর থেকে তার নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার সরকারি আমলা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার, ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে। তার ভাই নাহিদ মাজমাদার এবং ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত শালা কল্লোলও এই চক্রে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত করতে কাজল মাজমাদার বিভিন্ন চরমপন্থি দলের হয়েও অপরাধমূলক কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র থানাপাড়ার বাসিন্দা কাজল ক্রসফায়ারের ভয়ে গত দেড় দশক আত্মগোপনে থাকলেও অজ্ঞাত স্থান থেকে কুষ্টিয়ায় সন্ত্রাসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
কুষ্টিয়া সদরের ব্যবসায়ী সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজল আত্মগোপনে থাকলেও তার রাজত্বের হাল ধরেন তার ভাই ও শালা। আত্মগোপনে থেকেও সিভিল সার্জনের দপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। থানাপাড়াসহ এনএস রোডের ব্যবসায়ীরা তার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ।’ ব্যবসায়ী সংগঠনের এ নেতার দাবি, কাজল বর্তমানে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে ও মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার কথা বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের ঠিকাদারি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করেছেন কাজল। এরই মধ্যে নামে-বেনামে বাগিয়ে নিয়েছেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও জেলা কারাগারের টেন্ডার। বাদ যায়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সিভিল সার্জন অফিসও। জেলার বালুমহাল ও হাটবাজারগুলো দখল করে বসিয়েছেন তার লোকজন। আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের নিয়ে শোডাউন ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চলছে একের পর এক ‘দখলবাণিজ্য’।
বর্তমানে সরকারি দপ্তরগুলো নিয়ন্ত্রণ নিতে চরমপন্থি সংগঠন গণমুক্তি ফৌজের প্রধান শীর্ষ চরমপন্থি নেতা মুকুলের সঙ্গে সখ্য গড়েছেন। মুকুল গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ ও তার ছোট ভাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার আস্থাভাজন ছিলেন। তাদের হয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন মুকুল। একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, অস্ত্র লুটের টার্গেট করেই তার বাহিনী ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর থানায় থানায় ঢুকেছিল। লুট হওয়া অনেক অস্ত্র ওই বাহিনীর কাছে। এ ছাড়া কাজলের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাণিজ্যের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ পাঠান একাধিক ব্যক্তি। কুষ্টিয়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিগত সময়ে র্যাব-পুলিশের অভিযান শুরু হলে চরমপন্থি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ক্রসফায়ারের ভয়ে কুষ্টিয়া থেকে পালিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর কাজল মাজমাদার এলাকায় ফিরে আবার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। কাজল একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে গুম, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে।
তবে কাজল মাজমাদার তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, ‘আপনারা সবই জানেন কুষ্টিয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কী হচ্ছে? প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মিথ্যা-বানোয়াট অভিযোগ দিয়েই যাচ্ছে একের পর এক। প্রতিপক্ষ অভিযোগে বলেছে, হাট-ঘাট-বাজার-বালুমহাল সব আমি বা আমার লোকজন দখল করে নিয়েছে, এর কোনোটারই সত্যতা পাবেন না। আর একজন ঠিকাদারি ব্যবসায়ী হিসেবে আমার একটা লাইসেন্স আছে। হাসপাতালে দরপত্র আহ্বান করেছিল, আমি সেখানে যথাযথ নিয়মে আরও ১০ জনের মতো দরপত্র দাখিল করে লোয়েস্ট রেট দিয়ে কার্যাদেশ পেয়েছি, এটা কি আমার অপরাধ?’ কুষ্টিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘পদবঞ্চিত বিএনপি নেতা কাজল মাজমাদারের নাম শুনেছি, তবে তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু এখনো আমার জানা হয়ে ওঠেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তা তদন্ত করে দেখে সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
