কানাডার ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির নেতা হিসেবে জয়ী হয়েছেন ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি। একই সঙ্গে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাস্টিন ট্রুডোর স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি। গত রবিবার সদস্যদের ভোটে লিবারেল পার্টির নতুন নেতা বাছাই হয়। এতে কার্নি ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিনা ফ্রিল্যান্ড পেয়েছেন ১১ হাজার ১৩৪ ভোট। এর মধ্য দিয়ে কানাডার মন্ত্রিসভায় কোনো দায়িত্ব পালনের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া নির্বাচিত হওয়া দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন ৫৯ বছর বয়সী কার্নি।
ব্রিটিশ না হয়েও মার্ক কার্নি ২০১৩ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেন, যা ছিল ব্যাংকের ৩০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম। এর আগে, তিনি ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় কানাডার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে অন্যান্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রত্যাশীদের মতো কার্নি কখনোই নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না। তারপরও তিনি লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন। অবশেষে দলীয় ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচিত হয়ে তিনিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কানাডার আগামী সাধারণ নির্বাচন আয়োজনকে তার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্ক কার্নি বিশ্ব জুড়ে কাজ করলেও তার শেকড় কানাডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত শহর ফোর্ট স্মিথে। এক স্কুলপ্রধান শিক্ষকের সন্তান কার্নি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি অর্থনীতিতে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০০৩ সালে তিনি করপোরেট দুনিয়া ছেড়ে ব্যাংক অব কানাডার উপ-গভর্নর হিসেবে যোগ দেন। এরপর কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি মিনিস্টার হিসেবে কাজ করেন।
২০০৭ সালে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ঠিক আগে, তিনি ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর হন। তার নেতৃত্বে কানাডা অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়, যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেন, ঋণনীতিকে সহজ করা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ২০১৩ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রধান হওয়ার পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন। ব্যাংক তখন থেকে আর্থিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়, যা আগে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটির হাতে ছিল।
কার্নির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও তিনি বহুবার তা এড়িয়ে গেছেন। ২০১২ সালে একবার এক সাংবাদিক তাকে রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি রসিকতা করে বলেন, তাহলে সার্কাস ক্লাউন হওয়াই ভালো! তবে ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সাবেক অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর ট্রুডোর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। গুঞ্জন ছিল, ট্রুডো কার্নিকে অর্থমন্ত্রী করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্নিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে কানাডার ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করেছেন। কার্নি বরাবরই ট্রাম্পের সমালোচক। ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বৈশ্বিক আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেই সময় জি-২০ সম্মেলনগুলোয় নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কার্নির দাবি, সংকট মোকাবিলায় তার দক্ষতাই তাকে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে কানাডার নেতা হিসেবে এগিয়ে রাখবে। সম্প্রতি এক নির্বাচনী বিতর্কে তিনি বলেন, ‘আমি জানি কীভাবে সংকট সামাল দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা ও আলোচনার দক্ষতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
