ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে বিশেষ একটি আইন করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশ আকারে আগামী সপ্তাহে আইনটি করার বিষয়ে গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ফোকাস ছিল, পাচার করা টাকা কীভাবে আনা যায়। সেজন্য গত সেপ্টেম্বর মাসে ১১ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। পাচারের অর্থ ফেরাতে টাস্কফোর্স এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছেন শেখ হাসিনা ও তার পরিবার।
পাচারকারীরা নানাভাবে বিদেশে টাকা পাচার করেছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, ‘একজন বিদেশে তার সন্তানের টিউশন ফি বাবদ এক সেমিস্টারে (৬ মাস) পাঠিয়েছেন ৪০০-৫০০ কোটি টাকা। অথচ বছরে ১ কোটি টাকার ওপরে টিউশন ফি লাগার কথা নয়। এখানে দেখা যাচ্ছে টিউশন ফির নামে বিদেশে টাকা পাচার করা হয়েছে।’
শফিকুল আলম বলেন, এটা এক ধরনের মহা ডাকাতি। এটি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সরকার যে কোনো মূল্যে চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনতে চায়। সেজন্য বিশেষ আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শফিকুল আলম জানান, টাকা ফেরত আনার প্রচেষ্টা কতদূর এগিয়েছে, সেটার ওপর আজ (গতকাল) একটা বড় সভা হয়। সভায় নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা। সেই সভায় অনেকগুলো সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি মাসে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে এবং ঈদের পর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী ছিল।
বর্তমানে সংসদ না থাকায় আইনটি কীভাবে প্রণয়ন করা হবে জানতে চাইলে প্রেস সচিব বলেন, একটি নির্ধারিত পদ্ধতি হিসেবে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আইনি সহায়তা পেতে অনেক ল ফার্মের সঙ্গে সরকার ও টাস্কফোর্স কথা বলছে। ল ফার্মের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট করতে এ আইন সাহায্য করবে। ২০০ টি ল ফার্মের সঙ্গে আমরা ইতিমধ্যে কথা বলেছি। তবে এখনো সিলেকশন হয়নি। একটা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিলেকশন হবে। আমরা ৩০টার মতো ল ফার্মের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্টে যাব। সেটা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে।’
দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছিল। সেই বিষয়টি উল্লেখ করে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, কমিটির তথ্য বলছে ২০০৯ থেকে গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়। এর মধ্যে ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, হংকং, কেমান দীপপুঞ্জে হাসিনা ও তার পরিবারের লোকজনের সম্পদ পাওয়া গেছে বলেও জানান প্রেস সচিব।
বৈঠকে অর্থ পাচারের বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার সিদ্ধান্ত হয়, কীভাবে এটি ঘটেছে এবং কোথায় গেছে তা জানার সিদ্ধান্ত হয়। প্রধান উপদেষ্টা সভায় উপস্থিত সকলের কাছ থেকে আপডেট চেয়েছেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অর্থ ফেরত আনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সভায় আর্থিক খাতে জালিয়াতি, দুর্নীতিসহ সরকারি চুক্তিতে অনিয়মের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কমপক্ষে ৭৫ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার চুরি হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এসব অর্থ প্রাথমিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকংসহ অন্যান্য ট্যাক্সহেভেন অফশোর দেশগুলোতে পাচার হয়েছে।
এসব অর্থ ফেরত আনতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ১১টি কেস নিষ্পত্তি করতে আন্তর্জাতিক ল ফার্মস ও ফান্ডারস নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কেসের মধ্যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের নাম রয়েছে।
সভায় উপস্থাপন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যে এই ১১টি কেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্পদ ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কেসের কমপক্ষে অর্ধেক নিষ্পত্তি করাসহ অ্যাসেট রিকভারি এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করবে সরকার।
৯৭ শতাংশ পাঠ্যপুস্তক বিতরণ সম্পন্ন : ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ৩৮ কোটি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে ৯৭ শতাংশ বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। মার্চের মধ্যে বাকি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এই বছর পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ পাঠ্যবই বিতরণ করার কথা ছিল। এর মধ্যে ৩৮ কোটি ২৯ লাখ ৬১ হাজার কপি ছাপানো হয়েছে। ছাপানো বই মোট বইয়ের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ। এসব বই ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এখনো এক কোটি পাঁচ হাজার বই ছাপানো সম্ভব হয়নি।
আজাদ মজুমদার বলেন, সরকার মনে করছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব বই ছাপানো এবং বিতরণ করা সম্ভব হবে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ছাপানো এবং বিতরণ সম্পন্ন হবে। আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী বছরের পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ প্রেসসচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর ও সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি।
