দুর্যোগে দুর্ভোগ কমাবে জনবান্ধব পূর্বাভাস

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৫, ০৫:৪৬ এএম

দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে বজ্রপাতে। তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশই হলো কৃষক। কিন্তু এই বজ্রপাত দেশের কোন এলাকার ওপর দিয়ে কখন অতিক্রম করবে তা কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিতে আগে থেকেই জানার সুযোগ রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে এক ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও তা জনবান্ধব না হওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে মানুষ। শুধু কি বজ্রপাতÑ তাপপ্রবাহ, কৃষি আবহাওয়া, সামুদ্রিক আবহাওয়া কিংবা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনসহ নানা দুর্যোগে জনবান্ধব পূর্বাভাস ব্যবস্থার অভাবে দুর্যোগে দুর্ভোগ বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সম্মিলিতভাবে আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের বাধা দূরীকরণ’। আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধার বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের একাধিক আবহাওয়াবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন আবহাওয়া উপাত্ত দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য তথ্যের অবাধ প্রাপ্তি এবং তথ্যগুলো ব্যবহারের পদ্ধতি আমাদের জানতে হবে। তবেই সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।’

আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো যাচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সতর্ক সংকেত কিংবা যে সতর্কতা জারি করছি তা মাঠপর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে তা কিন্তু বিস্তারিত বর্ণনা করছি না। আর এতে এই সতর্কতা নিয়ে মানুষের মধ্যে পরিষ্কার ধারণার জন্ম নেয় না। আমাদের সতর্ক সংকেতের প্রভাব সম্পর্কে জানাতে হবে। একই সঙ্গে এই সতর্কতা যাতে মাঠপর্যায়ের মানুষ অনুধাবন করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’

সতর্ক সংকেত মাঠপর্যায়ে জনবান্ধব করতে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর যে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে তা স্থানীয় মানুষের বোধগম্য নয়। তাই তাদের বোঝার মতো করে সেই সংকেতকে মিডিয়ার মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের মতো যদি তাপপ্রবাহ, বজ্রপাত, কালবৈশাখী ঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগ দিনের কোন সময়ে কোথায় হবে তা মার্ক করে দেওয়া যায় তাহলে দুর্যোগে দুর্ভোগ অনেক কমে আসত।’

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্ক সংকেত কিংবা পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে গত ১৫ বছর ধরে স্থানীয় ভাষায় প্রচার করছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)। এ বিষয়ে ইপসার প্রধান নির্বাহী মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা কমিউনিটি “রেডিও সাগরগিরি”র মাধ্যমে চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় ভাষায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো প্রচার করে আসছি। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে শুধু সন্দ্বীপের জন্য “দ্বীপ রেডিও” এবং কক্সবাজারের উখিয়ার জন্য “রেডিও পালং” প্রচার করছি।’

তবে আবহাওয়ার সতর্ক সংকেত পদ্ধতি নম্বরের পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের আদলে চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে বলে মনে করেন সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, ‘আমরা হলুদ, অরেঞ্জ ও লাল এই তিনটি কালার সতর্ক সংকেতে ব্যবহার করতে পারি। এতে অনেক মানুষের বুঝতে সহজ হবে। যেমন বজ্রপাতের আগাম সতর্কতায় হলুদ দেওয়া হলে বোঝা যাবে এই এলাকায় বজ্রপাত হতে পারে। অরেঞ্জ হলো এই এলাকায় এখন বজ্রপাত হবে, তাই বের হওয়া যাবে না এবং লাল কালারের অর্থ হলো এখন বজ্রপাত হচ্ছে।’ ড. মোহন কুমার দাশ আরও বলেন, ‘এভাবে আমরা তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, টর্নেডো, কালবৈশাখী কিংবা ভারী-মাঝারি ও হালকা বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস দিতে পারি।’

আগাম সতর্কতা সংকেত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘আমরা যদি আগাম সতর্ক ব্যবস্থা চালু করতে পারি তাহলে অ্যাভিয়েশন, কৃষি, স্বাস্থ্য, বৃষ্টিপাতসহ সব ক্ষেত্রে দুর্যোগে দুর্ভোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি। এজন্য ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণা অনুযায়ী আমরা আগাম সতর্কতা সিস্টেম মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে কাজ করছি।’

আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে মৌসুমভিত্তিক আবহাওয়া এখন আর নেই। চৈত্র-বৈশাখ মাসে বেশি তাপমাত্রা থাকবে, জুলাই-আগস্ট মাসে বেশি বৃষ্টিপাত হবে কিংবা জানুয়ারিতে বেশি শীত অনুভব হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন আর নেই। এখন মার্চে এসেও শীত অনুভূত হচ্ছে, পরিবর্তন হয়ে গেছে বাতাসের গতিবেগ। আর এর সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে এখন আর আবহাওয়া আগের মতো নেই। দেশে গত বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। শীতের মৌসুমেও শীত তেমন দেখা যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত