ঈদে সরকারি ছুটির প্রত্যাশায় ইতালির মুসলমানরা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৫, ১২:২৪ এএম

পশ্চিম ইউরোপের দেশ ইতালি। দেশটিতে প্রায় ২৭ লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। রমজান মাসে ইতালির মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ঈদও অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপিত হয়। যদিও রমজান ও ঈদে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই এবং এক্ষেত্রে কোনো নমনীয়তাও প্রদর্শন করা হয় না। অথচ ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের পর ইতালির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে অবস্থান করছে ইসলাম। যেহেতু ইতালিতে মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই তারা রমজানে কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা এবং ঈদে সরকারি ছুটির প্রত্যাশা করছেন।

২০১৫ সালে সেন্টার ফর নিউ রিলিজিয়নস স্টাডিজ কর্র্তৃক পরিচলিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ইতালিতে ৫০ বছরে মুসলমানের সংখ্যা দুই হাজার থেকে বেড়ে ২০ লাখে পৌঁছেছে। আর গত ১০ বছরে মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭ লাখ। দেশটিতে প্রায় ২ হাজার নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মসজিদ ও নামাজের জায়গা রয়েছে। মুসলমানরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রমে এসব মসজিদে একত্র হন।

ইতালির মুসলমানরা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার এবং খোলা স্থানে একত্র হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন। যেহেতু মসজিদগুলোতে বড় জমায়েত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই অনেক সময় ঈদের নামাজ স্টেডিয়াম, পার্ক বা ভাড়াকৃত হলরুমেও অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামের চিরায়ত নিয়ম অনুযায়ী মুসলমানরা নামাজের পর একে অপরকে ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা জানান এবং আলিঙ্গন করেন। অনেক সংগঠন ঈদ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভূরিভোজন এবং দান-সদকার আয়োজন করে।

ইতালিতে মুসলমানদের ঈদে কোনো সরকারি ছুটি নেই। যারা চাকরি করেন বা পড়াশোনা করেন তারা সাধারণত ছুটি নিয়ে ঈদ উদযাপন করেন। তবে মুসলমানদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুব অল্প সংখ্যক কর্মসংস্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুসলিম কর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য ছুটির ব্যবস্থা রাখে।

উত্তর ইতালির পিওলতেল্লো শহরের ইকবাল মাসিহ স্কুলের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী মুসলিম। গত বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে স্কুলটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে স্কুল কর্র্তৃপক্ষ নানা সমালোচনা ও হুমকির মুখে পড়ে। তবুও স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ইতালির সংবাদ সংস্থা এএনএসএ-এর বরাতে জানা যায়, তখন স্থানীয় স্কুল অ্যাসোসিয়েশন স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তকে ‘উচিত নয়’ বলে আখ্যা দেয় এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। অনেক ইতালীয় রাজনীতিকও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এটাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। এরপরও স্কুল কর্র্তৃপক্ষ জানায়, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। স্কুলের প্রধান কর্তাব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রেরণা থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানাই, যা শিক্ষার অধিকার এবং ইতালীয় সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আমরা মনে করি।’

আবু বকর সুমাহোরো একজন ইতালীয় রাজনীতিবিদ এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। তিনি গত বছর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি ইতালির সংসদে একটি বিল উত্থাপন করবেন, যাতে ঈদুল ফিতরকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ওই সময়ে তিনি ইনস্টাগ্রামে লিখেন, ‘আজ ইসলাম ইতালির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। আমাদের প্রয়োজন দেশটির আইনগুলোকে বর্তমান এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। ইতালি বদলেছে, এটি বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে, ধর্মীয় দিক থেকেও। বহুত্ববাদী ইতালি দীর্ঘজীবী হোক।’

উত্তর ইতালির শিল্পাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তুরিনের মেয়র স্তেফানো লো রুসো পার্কো গত বছর ঈদের নামাজ শেষে হাজারো মুসলমানকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ‘তুরিন বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের মেলবন্ধনের মাধ্যমে তার পরিচয় গঠন করেছে, সংঘর্ষের মাধ্যমে নয়। আমরা এই পথেই এগিয়ে যেতে চাই। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে যখন দেখা হয়, তখন তাদের একে অপরকে বোঝার শিক্ষা নিতে হয় এবং একসঙ্গে বসবাস ও উন্নত নগর গঠনের জন্য যৌথ প্রচেষ্টা চালাতে হয়। আমরা সবাই মিলে ঠিক সেটাই করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত