তিনি কখনো ভাবেননি, ভিক্ষা করবেন। মানুষের সামনে কম্পিতভাবে মেলে ধরবেন এক সময়ের দৃঢ়-মুষ্টিবদ্ধ হাত। সংগ্রাম আর স্বপ্ন দেখার সেই মানুষটি, পথে পথে থাকেন। সেখানেই কাটে দিন-রাত। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করেন, কেবল জীবনকে বাঁচিয়ে রাখবেন বলে। শরীরের অনেক জায়গায় পচন ধরেছে। পরিচিত সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তিনিও আপনজন কারও কাছে, নিজের মুখ দেখান না। এ যেন তীব্র অভিমানের দীর্ঘ দিনলিপি।
গত মঙ্গলবার ২৫ মার্চ, ২০২৫। সন্ধ্যা তখনো নামেনি। মালিবাগ মোড়ের উল্টো পাশের ফুটপাত। পলিথিন বিছিয়ে এক পা ছড়িয়ে, ডান হাত প্রসারিত তার। বাম হাতের প্রায় পুরোটাই দগদকে ঘা। সেখানে মাছি বসছে একটু পরপর। ফলে ঢেকে রেখেছেন পুরনো গামছায়। উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে হাতের পচন থেকে। মাছির হাত থেকে বাঁচার জন্য মৃদুভাবে ডান হাত নাড়াচ্ছেন। সামনে দাঁড়াতেই তিনি হাত বাড়ালেন। বললেন ‘গিভ মি সামথিং! আই অ্যাম সো হাংরি।’ এমন কথা শুনে চমকে তাকালাম তার দিকে। লক্ষ করলাম, তিনি জলভরা স্থির চোখে তাকিয়ে আমার দিকে।
বললাম কী হয়েছে আপনার? বললেন কুষ্ঠ। ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন? উত্তরে জানালেন তাহলে কী খাব? এটাই তো সম্বল। এখন তো চাকরি করার অবস্থায় নেই। কেউ কি কাজ দেবে? তাই অনেক চিন্তা করে, এই পথে আসা। এভাবে আপনার জীবন চলে? তিনি হাসলেন। জানালেন একজনের পেট। চলে যায়। কী আর করব? আপনি পড়াশোনা করেছেন কতদূর? উত্তরে যা জানালেন, হতভম্ব হওয়ার মতো।
এসএসসি পাস করেছি ৮১ সালে। এরপর ৮৩-তে এইচএসসি। জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে ভর্তি হই ডিগ্রিতে। শেষ করতে পারিনি। এরপর সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। ছোট এক ভাই ছিল। মারা যায় পানিতে ডুবে। আমার জন্মের সময়, আম্মা মারা যান। তিনি ছিলেন, আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী। আব্বা এরপর আবার বিয়ে করেন। এখন যেন কোথায় থাকেন, জানি না। এক সময় জানতাম, তিনি চাকরি করেন টাঙ্গাইলে। সেটা তো প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। বাদ দেন। কিছু দিলে দেন, না হলে চলে যান। আমার ক্ষতি হচ্ছে। সারা দিন ভিক্ষা করে কত রোজগার হয়? ৭০০-৮০০। আপনাকে ১০০০ টাকা দিচ্ছি। আমাকে একটু সময় দেন। তিনি অনেকটা অবাক হয়ে বললেন কেন টাকা দেবেন? আমি তো কোনো কাজ করতে পারব না! আপনাকে কোনো কিছুই করতে হবে না। শুধু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিন। কষ্টের হাসি দিয়ে বললেন বলেন। কী জানতে চান? আপনাকে সুস্থ হতে হবে। এরপর একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেব। মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা পাবেন। করবেন? না।
কেন? নিজেকে আর সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে নেব না। কার জন্য নেব? আামার তো দরকার নেই। এখন যান তো? লাগবে না টাকা। বিরক্ত করবেন না। তবু তাকে বললাম, সামনে ঈদ। মৌচাক থেকে একটা শার্ট আর লুঙ্গি কিনে দিলে নেবেন? এমন কথা শুনে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন। বললেন টাকা ছাড়া কোনো ভিক্ষা নেই না। এটা তো ভিক্ষা না। ঠিক আছে, টাকাই নেন। তাকে ১০০০ টাকা দিয়ে বললাম, আগামীকাল কোথায় বসবেন?তিনি উত্তর দিলেন না। কিছুক্ষণ পর বললেন সায়েদাবাদ পাবেন। পরদিন? এখনো ঠিক করিনি। আমি ১ দিনের পরিকল্পনা করি। তারপর ঠিক করি, কোথায় বসব। আপনার নামটাই কিন্তু জানা হলো না? (চোখ বড় করে, নাক ফুলিয়ে বললেন আমার নাম, ফজলু। ডাক নাম- ফজু। তারপরে কিছু নাই। এখন যান।)
ঈদের দিন কী করবেন? তিনি এবার উত্তেজিত হলেন। প্রায় চিৎকার করে ১০০০ টাকা ছুড়ে ফেলে বললেন আপনার টাকা নিয়ে যান। মানুষের ভিক্ষা অনেক ভালো। তারপর...। তখন রাত প্রায় ৮টা। মনে হলো, সরকারের বিভিন্ন সহযোগিতার কথা। ছিন্নমূল, হতদরিদ্র মানুষের জন্য তাদের পক্ষ থেকে অনেক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সহযোগিতা মূলত কারা পাচ্ছেন? কীভাবে বণ্টন হচ্ছে? এছাড়া ফজলু মিয়া কি আদৌ ডিগ্রি পড়তেন? তিনি কি ছিন্নমূল! এমনটি ভাবতে ভাবতেই একটি চিৎকার কানে এলো। টের পেলাম, পেছন থেকে কেউ ডাকছেন। তাকাতেই দেখলাম, তিনি আসছেন গুটি গুটি পায়ে। বললেন আপনার নামটা? এরপর...
দুই. গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে। বিকেল পাঁচটা হবে। সেদিনও ছিল মঙ্গলবার। প্রায় বৃদ্ধ একজন মহিলা। তিনি সামনে একটি বাটি রেখে বসে আছেন। কিছুই বলছেন না। শুধু একটি হাত বাড়ানো তার। ইশারায় পথচারীদের বলছেন কিছু অর্থ দেওয়ার জন্য। হয়তো তিনি বোবা। এই রকম ভাবতেই মহিলাটি সামনে এলেন। শরীরে স্পর্শ করে, হাত বাড়ালেন। চোখ নাচিয়ে বোঝালেন, কিছু সহযোগিতার জন্য। লক্ষ করলাম, তার বাটিতে প্রায় ২০০ টাকা। বললাম, রোজ কত ভিক্ষা পান আপনি? তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর বাটির নিচে আরেকটি বাটিতে প্রায় ৮-৯শ টাকা দেখালেন। হাতের ইশারায় বোঝালেন, প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ টাকা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এইভাবে রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশে প্রতিদিন কত টাকা ভিক্ষা উঠছে? তারাও ট্যাক্স দিচ্ছেন। কিন্তু সরকার তাদের জন্য কতটুকু করেছে, তা আমরা পরিষ্কার না। তবে সঠিক পথে গেলে, হয়তো কোনো সুবিধা রয়েছে। যদিও তা সামান্য। কিন্তু খুব সহজে এভাবে লাখ লাখ ভিক্ষুকের উপার্জন, সমাজে এক ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি করছে। যারা শারীরিকভাবে সুস্থ, কর্মক্ষম তারাও বিভিন্ন টালবাহানায় ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়াচ্ছেন। এই প্রবণতা বন্ধ করা দরকার। চলতে ফিরতে রাজধানীতে ভিক্ষুকের অভাব নেই। যদিও সবাই ভিক্ষাবৃত্তির বাইরেও অন্য পেশা নিতে পারেন। কিন্তু এই রকম কি করা যায়, কিছু দেশের মতো- তাদের কোনো কাজে যুক্ত করে ভিক্ষাকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা? যেভাবে হোটেল সোনারগাঁওয়ের সামনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে? অবশ্যই এর আগে ভিক্ষুকের দিন যাপনের নিশ্চয়তা সরকারকে দিতে হবে। হয়তো সেদিন দ্রুত আসবে, নয়তো না।
লেখক: সাংবাদিক
