নির্বাচনী দৌড়ে কে এগিয়ে?

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১৩ এএম

চাপা উত্তেজনা-উৎকণ্ঠা-ঔৎসুক্য নিয়ে মে মাসের ১৮ তারিখ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে পর্তুগালের অভিবাসীরা, বিশেষ করে বাংলাদেশিরা। যদিও মার্চ মাসে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রোর ত্বরিত পতনের পর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস-আনন্দ-উচ্ছ্বাস বয়ে বেড়িয়েছিল অন্যান্য অভিবাসীসহ বাংলাদেশের মাঝে। কারণ যে দলটি তখন ক্ষমতায় ছিল, পিএসডি (Partido Social Democrata) তারা ছিল মধ্যডানপন্থি, যারা মাত্র এগারো মাস ক্ষমতায় থাকাকালে বন্ধ করে দিয়েছিল সেফ এন্ট্রি যেটিকে পুরো ইউরোপে পর্তুগালকে সবচেয়ে আস্থার দেশ হিসেবে অভিবাসীরা চিহ্নিত করেছিল। এর ফলে যেকোনো উপায়ে পর্তুগালে এসে উপস্থিত হলেই তারা বৈধ হতে পারতেন এবং রেসিডেন্ট কার্ড হাতে পেতে পারতেন। শুধু ভ্রমণ ভিসায় এসে বৈধ হওয়ার সুযোগ, ইউরোপে আর কোথাও ছিল না। কাজেই যখন লুইস মন্টেনেগ্রো ও তার দল পিএসডির পতন হলো তাও কি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় পারিবারিক বাণিজ্যে নিজের সম্পৃক্তির অপবাদ হাতে নিয়ে, সংসদে অভিযুক্ত হয়ে বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দদের অনাস্থা ভোটে, তখন পর্তুগালের সব অভিবাসী চাপা উচ্ছ্বাস-আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস দীর্ঘতর হবে কি না, কোনো অভিবাসীবান্ধব দল ক্ষমতায় আসবে, নাকি ভোটের পর আবার মন্টেনেগ্রো ক্ষমতায় আসবে, অথবা তার চেয়েও কঠোর কট্টর ডানপন্থি দল শেগা (Chega) আসবে, যার নামেই তার চরিত্র উঠে আসে ‘শেগা’ মানে ‘যথেষ্ট’ কীসে যথেষ্ট? মূলত পর্তুগালের উদারনীতি যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে এযাবৎকালে পর্তুগালে যতটুকু সুযোগ-সুবিধা ও আয়োজন হয়েছে অভিবাসীদের জন্য তা। তাই সংগতকারণেই অভিবাসীদের মনে একই সঙ্গে রয়েছে পিএসডি থেকে সম্প্রতি মুক্ত হয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও অন্যদিকে আবার যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তাহলে ভয় ও আতঙ্ক। তাই অভিবাসীদের আশা ও নিরাশার দোদুল্যমানতায় থেকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে, আগামী মাসের নির্বাচনের দিকে।

পিএসডি শুধু অভিবাসীদের বৈধ হওয়ার পথ রোধ করেনি বরং এখানে অবস্থানরত অভিবাসীদের যে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ ছিল, তাও বন্ধ করে দিয়েছিল কেবল জরুরি সেবা ছাড়া। তাই গত ১১ মাসে প্রায় তিন লাখের মতো অভিবাসী, যারা বৈধ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের জীবনকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করছিলেন এরা। কাজেই অভিবাসীরা কোনোভাবেই চান না, আগামী নির্বাচনে পিএসডি ক্ষমতায় আসুক। তাহলে কাকে চান অভিবাসীরা? কাকে চান বাংলাদেশিরা? এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য একটু পেছনে দেখা যাক। 

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পরপর তিনবার ক্ষমতায় ছিলেন অ্যান্টনিও কোস্তা ও তার দল পার্টিডো সোশ্যালিস্টটা (Partido Socialista) বা পিএস। অ্যান্টনিও কোস্তার প্রথম মেয়াদ ২০১৭ সালেই শুরু হয় অভিবাসীদের স্বর্ণযুগ পর্তুগালে যখন থেকে সব অভিবাসীকে বৈধ করার উদ্যোগ নেয় তার সরকার এবং সঙ্গে সঙ্গে রেসিডেন্ট কার্ডও পাওয়ার সুযোগ করে দেন। শুধু তাই নয়, সবার জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, যা কি না ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রায় সাড়ে তিন লাখ অভিবাসী অ্যান্টনিও কোস্তার তিন মেয়াদ থাকাকালীন নিয়মিত হয়ে এখন পর্তুগিজ নাগরিক। কাজেই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অভিবাসী তথা বাংলাদেশিরা অ্যান্টনিও কোস্তার দল, যা কি না মধ্যবামপন্থি তাদের চাইতেই পারেন। যত বামে যাওয়া যায়, তারা ক্ষমতায় এলে অভিবাসীদের ভয় নেই বরং আনন্দ। ঠিক উল্টোদিকে পিএসডি বা তার থেকে আরও ডানপন্থি বা কট্টর, শেগার মতো সরকার এলে অভিবাসী ও সবার জন্য আতঙ্ক।

গত ৫০ বছরে নির্বাচনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক। ১৯৭৪ সালে এপ্রিলের বিপ্লবের পর যার মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরের একনায়ক সরকারের পতন ঘটে, তারপর সাধারণ নির্বাচনে যে দলটি ক্ষমতায় আসে সেটি অ্যান্টনিও কোস্তার দল পিএস (Partido Socialista). তারা তখন ক্ষমতায় ছিল টানা ১০ বছর। তারপর ক্ষমতায় এসেছে পিএসডি (Partido Social Democrata)। তারাও সেবার ক্ষমতায় ছিল দশ বছর। তারপর গত প্রায় ৩০ বছরে পিএস (Partido Socialista) অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় ছিল বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় ২১ থেকে ২২ বছর। আর পিএসডি ভিন্ন ভিন্ন তিন মেয়াদে ছিল প্রায় নয় বছর। এখানে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, এই শতাব্দীতে পিএসডি কেবল পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল মাত্র একবার। বাকি দুবার তারা পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি একবার তিন বছর ও সর্বশেষ মাত্র ১১ মাস। সুতরাং এটা বোঝাই যায় যে, পর্তুগালে সরকার ব্যবস্থায় বামপন্থি ও মধ্য বামপন্থিদের প্রাধান্য। সে হিসেবে শেগার মতো কট্টর ডানপন্থি দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা, এককভাবে, বাদ দেওয়া যেতেই পারে। শুধু বাকি থাকে তাহলে দুটো দল : পিএস ও পিএসডি পার্টিডো সোশ্যালিস্টটা বনাম পার্টিডো সোশিয়াল ডেমোক্রাতা।  গত ৫০ বছরে যারাই মূলত ক্ষমতায় ছিল পর্তুগালে, এক দল মোটা দাগে ছিল প্রায় ৩০ বছর, অন্য দল প্রায় ২০ বছর। কিন্তু বাংলাদেশি তথা অভিবাসীদের জন্য স্বস্তির বিষয় এই যে, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সালের পর পর কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি পিএসডি।  সর্বশেষ এই মার্চ মাসের মাত্র ১১ মাস ক্ষমতায় থেকে পিএইচডির পতন হয়। যদিও অ্যান্টনিও কোস্তার অর্থাৎ পিএস (পার্টিডো সোশ্যালিস্টটা)-এর দল এর সর্বশেষ মেয়াদ, ২০২৪ সালে, সংক্ষিপ্ত ছিল। তার ওপর অর্থ কেলেঙ্কারির অপবাদ আনার পর তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে আসেন। তার পদত্যাগের পর অনুসন্ধান কমিটি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। প্রায় ছয় মাসের ব্যবধানে তিনি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। তাই বোঝা যায়, খুব অল্প সময়েই অ্যান্টনিও কোস্তা ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হয়ে এটা প্রমাণ করেছেন, তিনি ও তার দল পিএস কোনোরকম অর্থ কেলেঙ্কারিতে যুক্ত ছিলেন না। এই ব্যাপারটি পর্তুগালের রাজনীতিতে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।

অর্থ কেলেঙ্কারির অপবাদ খারিজ করাটা অ্যান্টনিও কোস্তার ও তার দলের জন্য অত্যন্ত জরুরি এই কারণে যে, আগামী মাসের নির্বাচনে যখন তার দল ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জনগণের কাছে কোন দলের ভাবমূর্তি কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক রয়েছে ওটাই নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করবে। পর্তুগালের রাজনীতিতে শেগার উত্থান অভিবাসীদের জন্য আতঙ্কের। ২০২২ সালে যাদের কেবল ১২টি আসন ছিল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে সেটি গিয়ে দাঁড়ায় মোট ২৩০টি আসনের মধ্যে ৫০টি। তার ওপর যদি নির্বাচনে কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারে আর পিএসডি ও শেগা এক হয়ে যায় তাহলে তো মোটামুটি একটি ডানপন্থি সরকার গঠন হতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে পর্তুগালের অভিবাসী ও অভিবাসীপ্রত্যাশীদের জন্য এটি একটি চরম দুঃসংবাদ। তবে সুখের খবর এই যে, এ দুটো দল ডানপন্থি হলেও একটি যেহেতু মধ্যপন্থি, অপরটি যেহেতু চরম ডানপন্থি, এদের মধ্যে দৈশিক ও নীতিগত বিষয়ে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। পিএসডির সাম্প্রতিক পতনের পেছনে শেগাপ্রধান আন্দ্রে ভেন্তরা খুব সরব ছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যখন এককভাবে পিএসডি সরকার গঠন করতে পারেনি শেগা কোনো ঐক্য গঠন করতে সাহায্য করেনি পিএসডিকে। কাজেই বোঝা যায়, শেগা চায় এককভাবে সরকার গঠন করতে। যেটি বাংলাদেশি ও অভিবাসীদের জন্য আপাতত সুখের সংবাদ, কারণ এই কারণে অন্তত শেগা পিএসডিকে আবারও সরকার গঠন করতে সাহায্য নাও করতে পারে।

আগামী নির্বাচনে মন্টেনেগ্রো ও তার দল ও সঙ্গে ছোট ছোট ডানপন্থি দল মিলে গঠিত এডি এবার ৮০টি আসনও যে পাবেন, পরিস্থিতি তা বলে না। নির্বাচনে পিএস ক্ষমতায় আসতে পারেনি দুটি কারণে এক, এর আগে তারা প্রায় ১০ বছর তারা ক্ষমতায় ছিলেন, দ্বিতীয়ত, এই দলের প্রধানমন্ত্রীর ওপর অর্থ কেলেঙ্কারির অপবাদ ছিল। যদিও তখনো অর্থ কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু হয়নি, তাও এই অভিযোগটি জনমনে প্রবল প্রভাব ফেলেছিল।  কিন্তু এখন যেহেতু পিএসের সাবেক প্রধান অ্যান্টনিও কোস্তার ভাবমূর্তি অনেকটা উজ্জ্বল, যেহেতু অর্থ কেলেঙ্কারির প্রমাণ হয়নি।  উল্টো দিকে পিএসডির প্রধান লুইস মন্টেনেগ্রোর ভাবমূর্তি অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ, যেহেতু পারিবারিক বাণিজ্যে তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্তির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তারই ফলে তাকেও তার দলকে মাত্র এক বছরের কম সময়ে পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং সেই কারণেই আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সুতরাং বলাই যায়, ভাবমূর্তির দৌড়ে পিছিয়ে আছেন মন্টেনেগ্রো আর অন্যদিকে পিএসের হয়ে নির্বাচন করছেন প্যাদ্রো নুনো সন্তোস, যিনি ২০২৪ সালের আগে অবকাঠামো ও বাসস্থান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পর্তুগাল ভোটিং ব্যবস্থা যেহেতু সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) ব্যবস্থানির্ভর, অর্থাৎ ভোটাররা স্থানীয় কোনো ব্যক্তিকে ভোট দেন না, দলকে ভোট দেন এবং মোট ভোটপ্রাপ্তির হিসেবে সমানুপাতিক হারে একেকটি দল আসন পেয়ে থাকেন। তাই প্যাদ্রো নুনো সন্তোস ও তার দলের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি, পিএসডিপ্রধান লুইস মন্টেনেগ্রো ও শেগাপ্রধান আন্দ্রে ভ্যানতুরার তুলনায় ভোটারদের বেশি আকর্ষণ করতেই পারে। অন্তত বাংলাদেশিসহ সব অভিবাসী সে কথাই ভাবতে চান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক লিসবোয়া, পর্তুগাল

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত