এনজিও নিরাপত্তা ছাড়পত্রে স্বরাষ্ট্রের নতুন গাইডলাইন

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৭ এএম

বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক সমালোচনা বন্ধে নানা নিয়মনীতির বেড়াজালে এনজিওর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল সরকার। ফলে ‘সরকারি প্রতিবন্ধকতায়’ মুখ থুবড়ে ছিল বেসরকারি সংস্থা। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে কমে গিয়েছিল বিদেশি দান-অনুদান। এমনকি সরকারের সমালোচনার জন্য গোয়েন্দা সংস্থা দিয়েও হয়রানি করা হয়েছিল বহু এনজিওকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ব্র্যাকসহ অনেক এনজিও সরকারের বিরাগভাজন হয়ে ওঠে ওই সময়। বিধিনিষেধে বহু বড় প্রকল্পে অর্থছাড়ে তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা। ফলে মুখ ফিরিয়ে নেয় অনেক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা। তবে এবার এনজিও নিরাপত্তা ছাড়পত্রে আসছে নতুন গাইডলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত জানুয়ারিতে বেশ কয়েক দফায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক এনজিও কর্তারা সরকারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেন। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন ২০১৬ সংশোধনের দাবি জানান তারা।

এনজিও কর্তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি করেন, আগের সরকার বৈদেশিক অনুদান আইনে বেশ কিছু বিতর্কিত ধারা দিয়েছিল, যাতে এনজিও কর্মকা- সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বিশেষ করে এ আইনের ধারা-১৪ অনুযায়ী ‘সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন কোনো মন্তব্য’ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধারাটিকে এনজিও কর্তারা বলছেন, ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রক্রিয়ায় এ আইনটি সংশোধন করা উচিত। আইনটির ধারা-৪-এ এনজিও নিবন্ধনের সময়সীমা নির্ধারিত করা ছিল না।

ওই বৈঠকের পর বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন গাইডলাইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ছয়টি নির্দেশনা দেয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।

ছয়টি নির্দেশনায় রয়েছে, এনজিও ব্যুরোতে আবেদন করার ৪৫ দিনের মধ্যে এনজিও নিবন্ধন করতে হবে; এ সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করা না গেলে তার কারণ উদ্যোক্তাদের জানাতে হবে; যেকোনো একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে এনজিওসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য ও পরিচয় খুঁজে দেখা যাবে; তদন্ত প্রতিবেদনে নেতিবাচক মতামতের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে হবে; বিদেশি নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিটের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের প্রস্তাবপ্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে মতামত দিতে হবে; কোনোভাবেই সেসব ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নিবন্ধন আটকে দেওয়া যাবে না।

জানা যায়, নিবন্ধনের পাশাপাশি ফান্ড রিলিজিওয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে ফান্ড রিলিজের নির্ধারিত কোনো সময়সীমা নেই। এ ছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানেরও সমালোচনার সুযোগ থাকছে।

গাইডলাইন সহজীকরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি ভালো দিক যে এই সংশোধিত নির্দেশনায় এনজিও নিবন্ধন ও নবায়নে যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল, তা দূর হবে। দিনের পর দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে না। সমাজসেবা ও জনসেবামূলক কর্মকা-কে প্রাধান্য দেওয়া হলে রাজনৈতিক হ্যারসমেন্টও কম হবে।’

তবে তিনি মনে করেন, শুধু নিবন্ধন আর তদন্ত প্রক্রিয়া সহজ হলেই হবে না। তিনি বলেন, ‘আগে বহুবার গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে থ্রেট করা হতো। ভিন্নমতের হলেই আটকে যেত প্রকল্পের অর্থছাড়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলেও কাজ সমাপ্ত করতে পারেনি।’

তবে সরকারের নতুন নির্দেশনায়, ওয়ার্ক পারমিট পেতে শুধু নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেওয়ায় এই সংস্থাগুলোর (এনজিও) কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে। পরে অর্থছাড়ের প্রক্রিয়াও সহজ হবে। সংশোধিত পরিপত্রের মাধ্যমে এনজিও ব্যুরো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকল্প অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে, যা এতদিন এনজিওগুলোর অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছিল।

এসব বিষয়ে জানতে সরকারের দুই উপদেষ্টা যারা মূলত পেশাগতভাবে এনজিও কর্তা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও আদিলুর রহমান খানকে ফোন করা হলে ফোন রিসিভ করেননি।

এনজিও ব্যুরো ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এনজিও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৬ সালে একটি আইন তৈরি করা হয় এবং ২০২১ সালে পরিপত্র জারি করা হয়। তবে সেই পরিপত্রের কিছু বিধি এনজিওগুলোর জন্য বাধার সৃষ্টি করেছিল। এনজিওকর্মী ও পরিচালকদের মতে, কঠোরবিধি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গিয়েছিল।

সংশোধিত পরিপত্র অনুযায়ী, এনজিও ব্যুরোতে জমা দেওয়া প্রকল্প প্রস্তাব ৪৫ দিনের মধ্যে অনুমোদন করতে হবে। আগের পরিপত্রে এ ধরনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। ফলে অনেক প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন পড়ে থাকত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য ৬০ কার্যদিবস সময় থাকলেও নতুন নিয়ম অনুযায়ী সেটি ৪৫ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মতামত না দিলে সেটিকে অনুমোদনপ্রাপ্ত বলে ধরে নেওয়া হবে। একইভাবে, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য ৩০ কার্যদিবস সময় থাকলেও এখন সেটি ৩০ দিন করা হয়েছে।

বিদেশি অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর জন্য আরেকটি বড় বাধা ছিল অর্থছাড়ের ধাপে ধাপে বিতরণ। আগে প্রথম ধাপে ৮০ শতাংশ অর্থছাড় করা হতো, পরবর্তী ২০ শতাংশ ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজন হলে একবারেই পুরো অর্থ ছাড় করা যাবে। তবে, প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদনের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বর্তমান আইনে যা আছে : আইনে না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয়ই মুখ্য; তদন্ত শেষ করার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন কোনো মন্তব্য করলে প্রচলিত আইনে অপরাধ; আবেদন করার কতদিনের মধ্যে সনদ ইস্যু করবেন, তা উল্লেখ নেই; ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ত্রাণ কর্মসূচি ছাড়া বৈদেশিক অনুদান অবমুক্তির আদেশ জারির সময়সীমা নির্দিষ্ট করা নেই; আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পরিবর্তন হয়ে যা হচ্ছে : রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সমাজসেবামূলক কাজে আবেদনকারীর সম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে; বিদ্বেষমূলক ও অশালীন শব্দদ্বয় বাদ যাচ্ছে। অথবা ব্যাখ্যা থাকবে আইনে; সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে প্রারম্ভিক নিবন্ধন ইস্যু করা হবে; কারণ দর্শানোর নোটিস ছাড়া কোনো অর্থছাড় বন্ধ করা যাবে না; আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত