দীর্ঘ ১৬ বছর পর চট্টগ্রাম-১৩ আসনের রাজত্ব দখলে মরিয়া বিএনপি। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে কামড়াকামড়ি চলছে নিজেদের মধ্যে। অন্যদিকে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে লাপাত্তা দেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সাবেক সাংসদ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। সাবেক এমপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের অনুসারীরা প্রকাশ্য দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর আানোয়ারা-কর্ণফুলীর রাজনীতির মাঠ ছিল সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একক নিয়ন্ত্রণে। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা ছিল পুরোপুরি কোণঠাসা। এমনকি আওয়ামী লীগের জাবেদবিরোধী গ্রুপও হালে পানি পায়নি। কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অন্যান্য আসনের মতো চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের রাজনীতির দৃশ্যপটও পাল্টে যায়। হাট-ঘাট থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছু রাতারাতি দখলে নেওয়া শুরু করে বিএনপির লোকজন। তবে এই দখলবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় দলের একটি গ্রুপ। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাড়ে দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ ও সাবেক সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ পৃথকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে থাকে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব হলে স্থানীয় রাজনীতিতে অনেকটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে তার নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। এলাকার তরুণদের বড় একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এর মধ্যে দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনীতির বাইরে থাকা সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজাম ফের আনোয়ারার রাজনীতিতে সক্রিয় হলে দলের মধ্যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়। বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের সিংহভাগ এবং হেলালবিরোধী গ্রুপ সরওয়ার জামাল নিজামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। গত রমজানে প্রতিটি ইউনিয়নে সরওয়ার নিজাম গ্রুপ ও লায়ন হেলাল গ্রুপের পৃথক ইফতার মাহফিল আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণের চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। এসব কর্মসূচি থেকে উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা পরস্পরকে বিষোদগার করে বক্তব্যও রাখেন।
এদিকে, বৃহস্পতিবার কর্ণফুলী উপজেলায় বিএনপির এক সাবেক নেতার মায়ের জানাজায় সরওয়ার জামাল নিজাম ও লায়ন হেলাল উদ্দিনের উপস্থিতিতেই সংঘর্ষে জড়ায় উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা। উভয় গ্রুপের বেশ কজন আহত হয়। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বিরাজ করছে উত্তেজনা। দেওয়া হচ্ছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক এমপি ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের একজন স্থানীয় নেতার মায়ের জানাজায় গিয়েছিলাম। সেখানে আমার ব্যানার ছেঁড়া ও আমার সমর্থকদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, আমি যখন এলাকার এমপি ছিলাম তখন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও কখনো এ ধরনের ঘটনার শিকার হননি। এটা রাজনীতির জন্য শোভন নয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের বক্তব্যের জন্য তার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করার পরও তিনি সাড়া দেননি। তার অনুসারী ও কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মুহাম্মদ ওসমান এ ঘটনার জন্য সরওয়ার নিজামের অনুসারীদের দায়ী করে বলেন, দীর্ঘদিন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও জানাজা পড়তে এসে একজন নেতার অনুসারীরা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরওয়ার জামাল নিজাম ও লায়ন হেলাল উদ্দিন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমশ চরম আকার ধারণ করছে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সারকে পরাজিত করে এবং ২০০১ সালে আখতারুজ্জামান বাবুকে হারিয়ে আনোয়ারা-পশ্চিম পটিয়া আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সরওয়ার জামাল নিজাম। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর কাছে পরাজিত হন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, কার্যত ২০০৮ সালের পর থেকে নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন নিজাম। ২০১৮ সালে দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও নির্বাচনী মাঠে নামতে পারেননি তিনি। এবার দলের অনুকূল পরিবেশ পেয়ে আবারও নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে এসেছেন তিনি।
