আগামীকাল ১৪ এপ্রিল উদযাপিত হবে বর্ষবরণ ১৪৩২ উৎসব। এর ঠিক দুদিন আগে গতকাল শনিবার ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ উপলক্ষে বানানো আলোচিত মোটিফ ‘ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি’ ও ‘শান্তির পায়রা’ মোটিফে আগুন দেওয়া হয়েছে। বাংলা নববর্ষ ঘিরে বরাবরের মতো এবারও উৎসবের প্রস্তুতির মধ্যে এ ঘটনা ঘটল।
বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম আয়োজন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি এবারের আয়োজনে থাকছে না। এই শোভাযাত্রার নতুন নাম হবে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়। ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের মোটিফ। এর মধ্যে ছিল পতিত স্বৈরাচারী সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার মুখাকৃতি। যাতে গতকাল খুব ভোরে আগুন দেওয়া হয়।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অভিযোগ, এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ‘ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দোসরদের’ হাত রয়েছে। অন্যদিকে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় এক সন্দেহভাজন যুবকের কথা জানিয়েছে চারুকলা অনুষদ। পুলিশ বলছে, আগুন দেওয়া হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকরা। এই জন্য তৈরি করা হয়েছে বড়, মাঝারি ও ছোট মোটিফ। শোভাযাত্রায় বড় মোটিফের মধ্যে থাকবে কাঠের বাঘ, ইলিশ মাছ, ৩৬ জুলাই (টাইপোগ্রাফি), শান্তির পায়রা, পালকি, জুলাই আন্দোলনে নিহত মুগ্ধের পানির বোতল। অন্যান্য মোটিফের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মুসলমানদের লড়াই ও সংগ্রামের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে তাদের প্রতীক হিসেবে তরমুজের মোটিফও থাকবে।
চারুকলা সূত্র আরও জানায়, এ বছর বাংলা নববর্ষের আনন্দ শোভাযাত্রায় জন্য বাঁশ-বেতের কারুকাজে তৈরি করা হয়েছিল এক দৈত্যাকৃতির ‘ফ্যাসিবাদী প্রতিকৃতি’, যার উচ্চতা ছিল প্রায় ২০ ফুট। যেখানে সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মুখাবয়বের দুপাশে ছিল শিংয়ের মতো অবয়ব। প্রতিকৃতিতে ইতিমধ্যেই প্রলেপের কাজ শেষ হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, এটিই ছিল এবারের শোভাযাত্রার প্রধান মোটিফ বা অবকাঠামো। শেষ সময়ে এসে দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে দুটি মোটিফ পুড়ে যায়।
আগুনের ঘটনায় যা বললেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা : হাসিনার দোসররা ফ্যাসিবাদের মুখাবয়ব পুড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। গতকাল শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এই দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে- সফট আওয়ামী লীগ হোক বা আওয়ামী বি টিম হোক- তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আসতে হবে দ্রুত।’
ফারুকী লিখেছেন, ‘এই শোভাযাত্রা থামানোর চেষ্টায় আওয়ামী লীগের হয়ে যারা কাজ করছে, আমরা শুধু তাদের আইনের আওতায় আনব তা না, আমরা নিশ্চিত করতে চাই এবারের শোভাযাত্রা যেন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও লিখেছেন, ‘গত কিছুদিন জুলাই আন্দোলনের পক্ষের অনেকেই বলেছিলেন, এবারের শোভাযাত্রা সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভিন্ন রকমের হচ্ছে। এখানে ফ্যাসিবাদের ওই বিকট মুখ না রাখাই ভালো। আমরাও সবরকম মত নিয়েই ভাবছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মত জানার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কালকের ঘটনার পর এই দানবের উপস্থিতি আরও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল।’ ‘জুলাই চলমান’ বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
কি বলছে বিশ^বিদ্যালয় কতৃপক্ষ : চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম চঞ্চল বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোর আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে। ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতিকে টার্গেট করে আগুন লাগানো হয়েছে। ওই আকৃতি পুরোটাই পুড়ে গেছে। একইসঙ্গে পায়রার অবয়বটাও পুড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ফজরের নামাজের পরেই খবর পাই। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস আসতে আসতে ওটার পুরোটাই পুড়ে যায়। আগুনটা ইচ্ছে করেই লাগানো হয়েছে।
নববর্ষের শোভাযাত্রা উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে বানানো মোটিফে এক ব্যক্তিকে আগুন দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে মোটিফে আগুন দিতে দেখা গেছে। তিনি প্রথমে পর্দার আড়ালে প্রবেশ করেছেন। তারপর মোটিফে লিকুইড দিয়েছেন। তারপর আড়ালে এসে লাইটার জ্বালিয়ে ফায়ার টেস্ট করেছেন। পরে মোটিফে আগুন দিয়ে বেরিয়ে গেছেন। যে গেট দিয়ে ঢুকেছিলেন, সে গেট দিয়েই বেরিয়ে গেছেন।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অপরাধীকে আজকে বের করতে পারলে আজই করব।’
আগুন ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ : আগুনে ‘ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি’ এবং ‘শান্তির পায়রা’ মোটিফ পুড়ে যাওয়ায় গতকাল বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চারুকলায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আপাতদৃষ্টিতে দেখে যেটা মনে হচ্ছে এটা এক্সিডেন্টাল না, কেউ ইনটেনশনালি এটা করছে। এটুকু আমরা নিশ্চিত। এখানে চতুর্পাশে অনেক ক্যামেরা আছে। আমরা ডিজিটাল রেকর্ডগুলো নেব, ফরেনসিক করব। ডিটেকশন করে ফেলব ইনশাআল্লাহ।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়- এখানে দুইটা মোটিফ পোড়ানো হয়েছে, এর মধ্যে বিগত সরকার প্রধানের মোটিফ ছিল। তার মোটিফ পোড়াতে গিয়ে সম্ভবত কবুতরের আংশিক অংশ পোড়ানো হয়েছে। তাহলে ওই জিনিসটা যারা লাইক করে না, তারা এ কাজটা করবে। এটা একটা অনুমাননির্ভর কথা।
আগুনের ঘটনায় মামলা : শোভাযাত্রার জন্য বানানো দুটি মোটিফে আগুনের ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন। মামলায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী অঙ্গ-সংগঠনের অজ্ঞাত নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর বলেন, চারুকলায় মোটিফে আগুনের ঘটনা বিভিন্ন বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করছি। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে কালো টি-শার্ট পরিহিত এক যুবককে রহস্যজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়।
আগুনের বিষয়ে যা বলল ফায়ার সার্ভিস : ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বলছে, তারা শনিবার ভোর ৫টা বেজে ৪ মিনিটে আগুন লাগার খবর পান। পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ৫টা ২২ মিনিটে আগুন নিভিয়ে ফেলে। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত- এ বিষয়ে সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা রুহুল আমিন মোল্লা গণমাধ্যমকে বলেন, নববর্ষের শোভাযাত্রা উদ্যাপনের জন্য অনেকগুলো মোটিফ সেখানে রয়েছে। এর মধ্যে কেন শুধু দুটি মোটিফে আগুন লেগেছে, সেটি রহস্যজনক।
তবে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান শিকদার বলেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না করে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে বলা সম্ভব নয়। তদন্ত করে আগুন লাগার রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে।
সাদা দলের নিন্দা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি ও শান্তির পায়রা মোটিফে আগুন দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। একইসঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় সংগঠনটি।
