নিউ ইয়র্কে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ নিয়েই আনন্দ উৎসব

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৫৬ পিএম

‘বাঙ্গালী পারেও, ২ ঘণ্টার জন্য নিউ ইয়র্ক শহররে থামায়ে রাখসে’, হাসতে হাসতেই কথাটা বলেছিলেন খালেদ মহিউদ্দিন, প্রখ্যাত সাংবাদিক। বাংলাদেশে বেশকিছু শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর জার্মানিতে ডয়েচে ভেলে এর বাংলা বিভাগের শীর্ষ পদে কাজ করে এখন যুক্ত নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’ এর সঙ্গে। গত রবিবার বাংলাদেশ ডে প্যারেড দেখতে এসেই তার এই অভিব্যক্তি।

বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনটা বাংলাদেশে ছুটি হলেও মার্কিন সরকার তো আর সেই দিনে ছুটি রাখেনি, তাই এখানকার সপ্তাহান্ত অর্থাৎ রবিবারের সঙ্গে মিল রেখেই হল বর্ষবরণ। আসলে শুধু বর্ষবরণ নয়, বলা যেতে পারে বাংলাদেশী সংস্কৃতির উদযাপন। ১৯০০ শতকে কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা জাহাজের খালাসিরা আমেরিকার বন্দরগুলোর কাছাকাছি এসে ঝাঁপ দিতেন পানিতে। এরপর সাঁতরে উঠতেন ডাঙ্গায়। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা পড়েছিল সে সময়কার পূর্ব বাংলার দামাল তরুণদের, নতুন জীবনের সন্ধানে যারা বেছে নিয়েছিলেন ঝুঁকিপূর্ণ উপায়। এক শতাব্দী পর আমেরিকার বুকে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা ২০২৩ সালের জনগণনা অনুযায়ীই ৩ লাখ ৩৩ হাজার ছাড়িয়েছে।

এই প্রজন্মের পরবর্তী প্রজন্ম, যারা জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক তাদের সংখ্যাটাও এর কাছাকাছিই হবে। এর বাইরে শিক্ষার্থী, অবৈধ অভিবাসী...সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে রক্তের টান আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন মানুষের সংখ্যা  নিউজিল্যান্ডের গোটা জনসংখ্যার সমান! তারা জড়িয়ে আছেন নানান পেশায়। বাংলাদেশ ডে প্যারেডে সবার আগে ছিলেন নিউ ইয়র্কের পুলিশ বিভাগে কর্মরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিকরা। কাজের কারণে নিশ্চয়ই সবাই আসতে পারেননি রবিবার সকালে, তারপরও তাদের জমায়েতটাই ছিল সবচেয়ে বড়। এরপর একে একে নিউ ইয়র্কের সংশোধনাগার বিভাগ, দমকল, ডাক বিভাগসহ বেশকিছু সরকারি সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিকদের একটি করে প্রতিনিধি দল অংশ নেয় মার্চ পাস্টে। নানা পরিচয়ে ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে মার্চ পাস্টে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউ ইয়র্কে সিলেটের জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, সিলেট প্রদেশ গণদাবী পরিষদ, নরসিংদী সমিতি, আমরা পাবনাবাসীসহ নানান জেলাভিত্তিক সংগঠন যেমন ছিল, তেমনি উপস্থিতি ছিল নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠনেরও।এছাড়াও নিউ ইয়র্কেরই বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের সংগঠনেরও ছিল সরব উপস্থিতি।

ফ্ল্যাটবেড ট্রেলারের উপর বিশেষভাবে স্থাপিত মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রিচি সোলায়মান,নাদিয়া, দেবাশীষ বিশ্বাস, প্রতীক হাসান সহ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ। বাংলাদেশের গানের সঙ্গে তারা নেচেছেন, গলা মিলিয়েছেন। এসেছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা জায়েদ খান, টেলিকম প্রতিষ্ঠান রিভার এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে। তার সঙ্গে ছবি তুলতে উৎসাহী ভক্তের অভাব ছিল না।তবে একই রকম খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে খালেদ মহিউদ্দিনকেও। বোঝাই যাচ্ছে, ইউটিউবে তার অনুষ্ঠানের দর্শকসংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

এই আনন্দ উৎসবের পেছনে আছে চাপা উদ্বেগও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নীতি এবং আইস (আইসিই; ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) এর অভিযানের কারণে অনেক বাংলাদেশীই প্রকাশ্যে আসতে ভয় পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন, বিয়ে করেছেন মার্কিন নাগরিককে,সন্তানরা জন্মেছে এখানেই এমন মানুষকেও ধরে বিতাড়িত করেছে আইস। মানুষটি পর্যটক ভিসায় এসে বিয়ে করে থেকে গিয়েছিলেন, নাগরিকত্বের আবেদনও করেছিলেন যা ঝুলেছিল লম্বা সময়। সুপারশপে বাজার করতে গিয়ে আইস এর এজেন্টদের হাতে ধরা পড়েছেন। কেউ আবার গ্রিনকার্ড ধারী, নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসরায়েল বিরোধী বক্তব্য খুঁজে বের করা হচ্ছে এবং তাদের ভিসা বাতিল হচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আছে চাপা আতঙ্ক। যারা ভ্রমণে এসেছেন তাদের জন্য নতুন বিড়ম্বনার নাম নিবন্ধন। ১১ এপ্রিল থেকে মার্কিন স্বরাষ্ট্র বিভাগ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগত সব বিদেশী যারা ৩০ দিনের বেশি অবস্থান করবেন তাদের অনলাইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর অনুমতিপত্র ডাউনলোড করে তা  সবসময় আবেদনকারীকে সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশীদের বড় অংশ এসেছে ডিভি লটারি ও পারিবারিক আবেদনের মাধ্যমে। মার্কিন সরকার চাইছে এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মত দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নীতির পথে হাঁটতে। এর ফলে অনেকেই হয়তো আগামীতে বাংলাদেশ থেকে বাবা-মা কিংবা ভাইবোনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসতে পারবেন না। বিবাহ সূত্রে গ্রিনকার্ডধারীরা তাদের সঙ্গীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার বেলাতেও এখন আরও অনেক বেশি যাচাই বাছাই এর মুখোমুখি হবেন, চাওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য সহ অনেক কিছু। পুনরায় চালু হয়েছে সাক্ষাৎকার ব্যবস্থা যা বাইডেন প্রশাসনের সময়ে স্থগিত ছিল।

সব মিলিয়ে আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশী সমাজে আছে চাপা অস্বস্তি। একদিকে বাংলাদেশ থেকে স্বজনদের অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের আশঙ্কা,অন্যদিকে শুল্ক যুদ্ধে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে অজানা ভয়। এত কিছুর মাঝেও সব ভুলে বাংলাদেশ ডে প্যারেডে দেশীয় সংস্কৃতির উদযাপনে আনন্দে মেতেছিলেন নিউ ইয়র্কে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত