ট্রাম্প-শুল্ক বিশ্বায়নবিরোধী

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১৯ এএম

১৬৫২-৫৩ সালে হয় প্রথম অ্যাংলো-ডাচ বাণিজ্যযুদ্ধ। এটি ছিল ইংল্যান্ডের কমনওয়েলথ এবং ডাচ প্রজাতন্ত্রের মধ্যে নৌ সংঘাত। তারপর আবার তাদের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৬৬৫ সালের ৪ মার্চ। শেষ হয়েছিল ১৬৬৭ সালের ৩১ জুলাই ‘ব্রেডা’ চুক্তির মাধ্যমে। দীর্ঘ সময়ে অনেকবার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এর ফলে অর্থনীতিসমৃদ্ধ দেশগুলো বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে গেলে বৈশ্বিক জিডিপির ব্যাপক সংকোচন হয়। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে আইএমএফ। আসলে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণার ফলে বিশ্ববাণিজ্যে ধস  নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন এই শুল্কনীতির জেরে বিশ^বাণিজ্য প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ^বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপে বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে। এর ফলে বড় বড় প্রায় সব  শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। বিশ^বাণিজ্যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। চীনের পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো ওয়াল স্ট্রিটে ব্যাপক দরপতন হয়েছে।

নজিরবিহীন শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর চীন এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অনেকে বলেছেন, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে উত্তেজনা শুধু বাড়িয়ে চলছেন। দেশটি থেকে এখন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য প্রবেশ করতে অন্তত ১০৪ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। আবার তারাও ওয়াশিংটনের ওপর পাল্টা ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইএমএফে মামলা ঠুকে দিয়েছে বেইজিং। বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ও বাংলাদেশ : অভিঘাত ও প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সংলাপে বলা হয় ‘এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিকল্প বাজারের অনুসন্ধান করতে পারে। পাশাপাশি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। এতে বাণিজ্য বিরোধ হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু বিশ্ব বাস্তবতায় এফটিএ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ অন্য দেশের জন্য যে ধরনের শুল্কনীতি বাস্তবায়ন করে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য হবে। কাজেই এ বিষয়ে বাংলাদেশকে বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।’ রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও বর্তমানে এশিয়ার বাজার সবচেয়ে বড়। এখানে সাড়ে তিন বিলিয়ন মানুষের বাজার রয়েছে। এ বাজারের দিকে বাংলাদেশকে মনোনিবেশ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে অন্যান্য দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটি দেখে ধীরে-সুস্থে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি নিজেদের যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আছে, তার মধ্য থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের বাজার বড় করার চেষ্টা করা উচিত বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। মূল প্রবন্ধে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে ১৮ কোটি ডলার আমদানি শুল্ক পাওয়া গেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্যে ১২৭ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যতে নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেইন। বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এমন অস্থিরতা দেখা যায়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিশ^ায়নবিরোধী শুল্ক আরোপের কারণে বিশ্বের অনেক দেশ বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এসব দেশ ক্ষতি পূরণ করতে একে অপরের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করবে। এতে বিশ্বায়ন চলমান থাকলেও, সেটি আর যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে হবে না। তবে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোন নীতি নিয়ে অগ্রসর হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত