এআই উত্তর দেয়, শিক্ষক মানুষ গড়েন

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ এএম

মাত্র কয়েক বছর আগেও কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে পাঠ্যবই খুলত, শিক্ষকের কাছে যেত কিংবা গ্রন্থাগারে খোঁজ করত। আজ দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। একটি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি অ্যাপ এই তিনটিই এখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞানের সহজলভ্য উৎস। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রচনা, প্রবন্ধ, গণিতের সমাধান, প্রোগ্রামিং কোড কিংবা কোনো বিষয়ের সারসংক্ষেপ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি এআই-ই উত্তর লিখে দেয়, তাহলে শিক্ষক কী শেখাবেন? প্রশ্নটি শুনতে সহজ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ভাবনা। কারণ শিক্ষা কখনোই শুধু উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। উত্তর জানা আর জ্ঞানী হওয়া এক বিষয় নয়; তথ্য পাওয়া আর প্রজ্ঞা অর্জন করাও এক বিষয় নয়।

আজকের শিক্ষার্থীরা তথ্যের অভাবে নয়, বরং তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। কিন্তু তথ্যের এই সাগরে কোনটি সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর, কোনটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং কোনটি নির্ভরযোগ্য তা বুঝে নেওয়ার সক্ষমতা সবার নেই। এই দক্ষতা তৈরি করার কাজ কোনো সফটওয়্যারের নয়; এটি একজন শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন আইসিটি শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির এই পরিবর্তন প্রতিদিনই অনুভব করি। আগে শিক্ষার্থীরা জানতে চাইত, কম্পিউটার কীভাবে চালাতে হয়, একটি ফাইল কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় কিংবা একটি প্রোগ্রাম কীভাবে লেখা হয়। এখন তাদের অনেকের প্রশ্ন, এআই ব্যবহার করে কীভাবে দ্রুত ও সহজে কাজ করা যায়। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং আমাদের বুঝতে হবে, প্রযুক্তি বদলেছে, তাই শিক্ষকের ভূমিকাও বদলাবে। তবে গুরুত্ব কমবে না, বরং আরও বাড়বে। আজ একজন শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবই পড়ালে চলবে না। তাকে শেখাতে হবে কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয়। কারণ সঠিক প্রশ্ন করতে না পারলে এআই থেকেও কাক্সিক্ষত উত্তর পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে এআইয়ের দেওয়া উত্তর যাচাই করার সক্ষমতাও শিক্ষার্থীর থাকতে হবে। যে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে জানে না, সে ভবিষ্যতে উদ্ভাবন করতেও পারবে না।

এআই কখনো ভুল করে না, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অনেক সময় এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দিতে পারে, কাল্পনিক তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্য দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। তথ্যকে যাচাই করতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে এবং যুক্তির আলোকে গ্রহণ করতে হবে। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তথ্য নয়; বরং তথ্য ব্যবহারের দক্ষতা। একজন শিক্ষার্থী যদি তথ্য বিশ্লেষণ করতে না পারে, তাহলে হাজারো তথ্যও তার কোনো কাজে আসবে না। এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকেরই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। শ্রেণিকক্ষ এমন একটি জায়গায় পরিণত হওয়া প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু উত্তর মুখস্থ করবে না; বরং প্রশ্ন করবে, আলোচনা করবে, যুক্তি উপস্থাপন করবে, গবেষণা করবে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার সাহস অর্জন করবে। এ অবস্থায় একজন শিক্ষক আর শুধু বক্তা নন। তিনি একজন সহযাত্রী, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণাদাতা।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই শিক্ষার্থীদের এআই থেকে দূরে রাখা কোনো সমাধান নয়। বরং তাদের শেখাতে হবে কীভাবে এই প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতা, গবেষণা, সমস্যা সমাধান ও মানবকল্যাণে ব্যবহার করা যায়। একজন আইসিটি শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, এখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘এআই সাক্ষরতা’ অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে। শিক্ষার্থীদের জানতে হবে এআই কী, কীভাবে কাজ করে, এর সীমাবদ্ধতা কোথায়, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। কারণ প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, তার সঠিক ব্যবহার শেখানোর দায়িত্বও তত বাড়বে। ইতিহাস সাক্ষী, প্রযুক্তি কখনো শিক্ষকের প্রয়োজন শেষ করে দেয়নি। ব্ল্যাকবোর্ড এসেছে, প্রজেক্টর এসেছে, কম্পিউটার এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে প্রতিবারই মনে হয়েছে প্রযুক্তি হয়তো শিক্ষকের ভূমিকা কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, প্রযুক্তি যত এগিয়েছে, দক্ষ শিক্ষকের প্রয়োজন ততই বেড়েছে।

এআইকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এটিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক যদি এআইকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাদানকে আরও কার্যকর করতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীরাও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখবে। কিন্তু শিক্ষক নিজেই যদি প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের সঠিক পথ দেখানো কঠিন হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত একটি সত্য কখনো বদলাবে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর লিখে দিতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন করতে পারে না। এটি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ শেখাতে পারে না। ভাষা তৈরি করতে পারে, কিন্তু বিবেক তৈরি করতে পারে না। যন্ত্র একজন দক্ষ কর্মী তৈরিতে সহায়তা করতে পারে; কিন্তু একজন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব আজও শিক্ষকের কাঁধেই। প্রশ্নটি যদি হয় এআই যখন উত্তর লিখে দেয়, তখন একজন শিক্ষক কী শেখাবেন? উত্তর একটাই শিক্ষক উত্তর নয়, মানুষ গড়তে শেখাবেন; তথ্য নয়, প্রজ্ঞা অর্জনের পথ দেখাবেন; প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের বিবেক গড়ে তুলবেন। এই দায়িত্ব কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই গ্রহণ করতে পারবে না।

লেখক : শিক্ষক, আইসিটি

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত