মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ও আলোচিত মসজিদগুলোর একটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব মসজিদ, যা কাতারের জাতীয় মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। এই সুবিশাল মসজিদটি শুধু ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র নয়, বরং কাতারের সামাজিক ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে ১৮ শতকের প্রখ্যাত আলেম ও সংস্কারক ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের নামে। তার আহ্বান ছিল কোরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক ইসলামে ফিরে যাওয়া, শিরক ও বিদআত পরিহার করা এবং তাওহিদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। যদিও তার কিছু মতাদর্শ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে, তবুও তার প্রভাব আরব রাজনীতিতে আজও দৃশ্যমান।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব মসজিদটি ঐতিহ্যবাহী আরব স্থাপত্যের সঙ্গে আধুনিকতার চমৎকার সমন্বয়। ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৬৪ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই মসজিদে একসঙ্গে নামাজে অংশ নিতে পারেন প্রায় ৩০ হাজার মুসল্লি। প্রধান নামাজ কক্ষে পুরুষদের জন্য রয়েছে ১১ হাজার জন ধারণক্ষমতা এবং নারীদের জন্য আলাদা অংশে ১২০০ জনের জায়গা।
মসজিদটির স্থাপত্যে রয়েছে ৯৬টি গম্বুজ। এর মধ্যে প্রধান নামাজ কক্ষে ২৮টি, বাইরের প্রাঙ্গণে ৬৫টি এবং মিহরাব ও মিনারের গম্বুজসমূহ রয়েছে আলাদাভাবে। পুরো মসজিদ এলাকায় রয়েছে তিনটি প্রধান ফটক এবং ১৭টি পার্শ্বপ্রবেশপথ। আধুনিক শব্দপ্রযুক্তি, চমৎকার আলোকসজ্জা, হুইলচেয়ার ব্যবহারে উপযোগী ঢালু পথ ও সিঁড়ি এবং লাইভ সম্প্রচারের জন্য স্থায়ী ক্যামেরা নেটওয়ার্ক এটিকে করে তুলেছে সময়োপযোগী ও জনবান্ধব।
প্রধান মসজিদের বাইরে রয়েছে প্রশস্ত খোলা প্রাঙ্গণ, চমৎকার বাগান এবং তিন হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। মসজিদের নিজস্ব পাঠাগার রয়েছে। নানা বিষয়ে অসংখ্য বই রয়েছে এ পাঠাগারে। অত্যাধুনিক ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে মসজিদের অজুখানা। পুরুষ ও নারীদের জন্য ওজুখানায় পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহৃত হয়েছে ২৮টি বহুস্তরীয় তামার ঝাড়বাতি, যেগুলো ১৪ মিটার উচ্চতায় ঝোলানো। শব্দপ্রযুক্তি ব্যবস্থা অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত, যা প্রতিধ্বনি কমিয়ে শব্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
চত্বর ও বারান্দার মেঝে পালিশ করা মাটির রঙের মার্বেল দিয়ে তৈরি। বারান্দাগুলোর প্রতিটি ছোট গম্বুজে ঝুলছে তামার ঝাড়বাতি, যা রাতের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। দক্ষিণ দেয়ালের চারটি জানালা মেহরাব ও মিম্বরকে কেন্দ্র করে স্থাপন করা। মেহরাবের উচ্চতা ১১ মিটার, এটি সাদা মার্বেলে তৈরি এবং ওপরের অংশে আল্লাহর নাম খচিত। মেহরাবের বাইরের দিকে দুটি ছোট গম্বুজ রয়েছে।
এই মসজিদে কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জুমার খুতবা ও জাতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। দেশটির ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় এটি ধর্মীয় নীতিমালার কেন্দ্রে অবস্থান করে।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব মসজিদ শুধু কাতারের নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এটি ইসলামি ঐতিহ্য ও আধুনিক স্থাপত্যের মিলনস্থল। এর গঠনশৈলী ও ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন বিস্ময় জাগায়, তেমনি এর ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব মুসলমানদের মধ্যে নানা বিষয়ে আলোচনার দ্বার খুলে দেবে বলে মধ্যপ্রাচ্যের গবেষকদের বিশ্বাস।
