নীল চ্যানেলে সোনালি স্বপ্নের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২০ এএম

নীল চ্যানেলে সোনালি স্বপ্নের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। দেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী চ্যানেলে ২৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের জেটি নির্মাণের কাজ করছে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ চুক্তি হবে। এতে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম চ্যানেলে এখন কয়লাবাহী জাহাজ ভিড়লেও আগামীতে কনটেইনার ও পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে। প্রায় ১৬ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে পাওয়া যাবে গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা।

কয়েক বছর আগেই ৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে তৈরি করা হয়েছিল ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৫০ মিটার চওড়া ও ১৬ মিটার ড্রাফটের চ্যানেল।

সেই চ্যানেল দিয়ে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লবাহী জাহাজ ভিড়ছে কয়লার জেটিতে। কিন্তু বন্দরের বাণিজ্যিক জাহাজ ভেড়ানোর জন্য জেটি এতদিন নির্মাণ হয়নি। এখন শুরু হচ্ছে সেই জেটি নির্মাণের কাজ। জাপানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান ও থোয়া করপোরেশন জেটি নির্মাণের কাজটি করবে। ২০২৯ সালের জুন বা জুলাই মাসে মাতারবাড়ী বন্দর ব্যবহার করে পণ্য ওঠানামা করার ব্যাপারে আশাবাদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক। তিনি বলেন, মাতারবাড়ী হবে আমাদের নৌ-বাণিজ্যের হাব। মাদারভেসেলগুলো (বড় জাহাজ) বেশি কনটেইনার নিয়ে মাতারবাড়ীতে আসবে। আমরা সেখান থেকে জলপথে, সড়কপথে কিংবা রেলপথে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পণ্য পৌঁছে দিতে পারব। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, পায়রা ও মোংলা বন্দরেরও কানেকটিভিটি বাড়বে এবং আমাদের পাশ^র্বর্তী দেশের বন্দরগুলোও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা নিতে পারে।

মাতারবাড়ী বন্দরে কত ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মাতারবাড়ীতে ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১৪ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়াতে পারব। এসব জাহাজের প্রতিটিতে প্রায় ৮২০০ একক কনটেইনার থাকতে পারবে।

কী পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করা যেতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে ওমর ফারুক বলেন, ২০২৯ সালে আমরা ৬ লাখ থেকে প্রায় ১১ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ২২ থেকে ২৬ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করার ব্যাপারে আশাবাদী।

এদিকে মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণের শুরুতে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ও বর্তমানে অবসরে যাওয়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাপান মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এখানে বন্দর গড়ে তোলার প্রস্তাবনা দেয়। এর আগে সোনাদিয়া বন্দর নির্মাণের সমীক্ষাও জাপানই করেছিল। ফলে এই এলাকার ওপর তাদের একটা ভালো নলেজ রয়েছে। আর এরই ফলে মহেশখালীতে তাদের এই বিনিয়োগ। এতে তাদের দেশের কোম্পানিগুলোর যেমন প্রসার হচ্ছে, তেমনি আমাদের দেশের মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজার বেল্টের উন্নয়ন হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জাপানের একটি ইনিশিয়েটিভ রয়েছে, যা বিগ বি নামে পরিচিত। বঙ্গোপসাগর ঘিরে এই বিগ বি-এর অন্যতম অংশ হচ্ছে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। এনার্জি, পাওয়ার ও ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে পুরো এলাকাটি একটি পৃথক শিল্পজোন হিসেবে বিকাশ লাভ করবে। বর্তমান সরকারও সেভাবে পরিকল্পনা নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, দুটি টার্মিনাল নির্মাণ হলে একসঙ্গে একটি সাধারণ মালবাহী ও একটি কনটেইনারবাহী মাদারভেসেল ভিড়তে পারবে। এসব টার্মিনাল পরিচালনায় উন্নত প্রযুুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো থাকবে বলে আট হাজার টিইইউস ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে আড়াই থেকে তিন হাজারের কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারে। বড় জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো গেলে পণ্য পরিবহনে খরচ কমবে। সবচেয়ে বড় কথা ইউরোপ আমেরিকায় সরাসরি জাহাজ সার্ভিস চালু করা যাবে। এর ফলে আমাদের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ আরও সুবিধাজনক অবস্থানে যাবে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, মাতারবাড়ী শুধু বাংলাদেশের নয়, এ অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানির জন্য এ বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে তা বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে রূপান্তরিত করবে। আঞ্চলিক বন্দর হিসেবে মাতারবাড়ীকে গড়ে তোলা যাবে।

২০১৬ সালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নেয় সরকার। জাইকার অর্থায়নে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৬ মিটার ড্রাফট (গভীরতা) এবং ২৫০ মিটার চওড়া চ্যানেল নির্মাণ হয় বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায়। কয়লা বিদ্যুতের চ্যানেলের ওপর ভিত্তি করে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা যায় উল্লেখ করে জাইকা একটি প্রস্তাবনা দেয়। সেই প্রস্তাবনা ও পরবর্তী সময়ে সমীক্ষার পর ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। আর এরই আওতায় চ্যানেলের চওড়া ১০০ মিটার বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতাও ১৮ মিটারে উন্নীত করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর আগে দুটি প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হলেও জেটি নির্মাণের প্যাকেজ বাকি ছিল। এখন জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত