বোরকা পরে আসে খুনিরা, কুপিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে যায়

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:১০ পিএম

ফেনীর সোনাগাজীতে বোরকা পরে আসা সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাতে আবুল হাসেম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) ভোর ৬ টার দিকে মহাসড়কের ওলামাবাজার সংলগ্ন সাজেদা ফাউন্ডেশন নামের এনজিও অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

নিহত ব্যক্তির নাম আবুল হাসেম। তিনি উপজেলার দক্ষিণ চরদরবেশ গ্রামের হাদা ব্যাপারীর দোকান এলাকার আবুল হাসেমের ছেলে।

ঘটনার পর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার আগে অন্তত ৫ জন বোরকা পরা সন্ত্রাসী সাজেদা ফাউন্ডেশন অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। পরে তারা সড়কের উভয় পাশের বৈদ্যুতিক পিলারে সবুজ রঙয়ের রশি বেঁধে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ফজরের নামাজের পর আবুল হাসেম মোটরসাইকেলে করে ওলামাবাজারের দিকে পৌঁছলে ঘটনাস্থলে রশি দেখে থেমে যায়। এসময় বোরকাপরা সন্ত্রাসীরা সড়কের পাশ থেকে বেরিয়ে আবুল হাসেমকে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। সে রাস্তায় পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার এক হাত ও এক পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আবুল হাসেমের আত্ম চিৎকারে ঘটনাস্থলের আশপাশের নারী পুরুষ বেরিয়ে এলে বোরকাপরা সন্ত্রাসীরা পাশের কাচা সড়ক হয়ে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যায়।

স্থানীয় ওজি উল্লা নামে এক ব্যক্তি বলেন, চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে এসে দেখতে পাই আবুল হাসেম মুমূর্ষ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, রক্তে পিচঢালা রাস্তা লাল হয়ে গেছে। প্রায় আধাঘন্টা সড়কে পড়ে থাকার পর তার আত্মীয় স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।  

ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির স্থানীয় এক নারী বলেন, ফজরের আযানের পর সড়কের পাশের পুকুর থেকে পানি আনতে যাই। ওই সময় বোরকা পরা ৪/৫ জন ব্যক্তি আমাকে শাসিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলেন। তাদের ভয়ে বাড়ি এসে নামাজ শেষ করার সাথে সাথে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনে বেরিয়ে দেখি বোরকা পরা ব্যক্তিরা দ্রুত দক্ষিন দিকে পালিয়ে যাচ্ছে।

নিহতের আত্মীয় জসিম উদ্দিন বলেন, হামলার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে সোনাগাজী হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতাল থেকে মুমূর্ষ অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেওয়ার পথে কাচপুর ব্রিজের সামনে মৃত্যুবরণ করেণ। তার লাশ বর্তমানে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

তিনি আরো জানায়, প্রাণভয়ে আবুল হাসেম সোনাগাজী পৌরশহরে পরিবার নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। তার পালিত মহিষের দুধ দোহনের জন্য প্রতিদিন ভোরে এলাকায় আসতেন। সন্ত্রাসীরা তার আসা যাওয়ার খবর জানতে পেরে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ননা মিয়া ও হাদা ব্যাপারির পরিবারকে দায়ী করেছেন।  

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর আগে আবুল হাসেম তার উপর হামলাকারীদের নামও বলে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি সংক্রান্ত দ্বন্ধের জেরে নিহত আবুল হাসেমের পরিবারের সাথে হাদা ব্যাপারী পরিবারের গত ৩০ বছর ধরে বিরোধ রয়েছে চলছে । গত ২০ বছর আগে হাদা ব্যাপারি পরিবারের সদস্যরা আবুল হাসেমের পিতা আব্দুস শুক্কুরকে পিটিয়ে দুই পা ভেঙ্গে দিলে তিনি অনেকটা পঙ্গত্ববরণ করেণ। এরমাঝে স্থানীয় ননা মিয়া পরিবারের সাথে নিহত আবুল হাসেম পরিবারের বিরোধ শুরু হয়। এ বিরোধের ইন্ধনের জন্য আব্দুস শুক্কর দায়ী করেন হাদা ব্যাপারি পরিবারকে।

এ বিরোধের জেরে ৩ বছর আগে ননা মিয়া পরিবারের বেলাল খুন হয়। হত্যাকান্ডের জন্য ননা মিয়া বাদি হয়ে আবুল হাসেম, তার পিতা আব্দুস শুক্কুর সহ ৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর গত বছরের জুন মাসে আবুল হাসেম ও পরিবারের সদস্যরা জামিনে মুক্তি পায়। এদিকে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন হাদা ব্যাপারি পরিবারের আবু সুফিয়ান মেম্বার সহ কয়েকজনকে পিটিয়ে গুরতর জখন করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার জন্য হাদা ব্যাপারি পরিবার আবুল হাসেমকে দায়ী করলেও নিরিপত্তাজনিত কারনে মামলা করতে পারেনি।

গত কয়েকমাস আগে ননা মিয়াকে ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হতাহতের তিনটি মামলায় র‌্যাব গ্রেপ্তার করে। জামিনে মুক্তি পেয়ে ননা মিয়া তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য আবুল হাসেম দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিন পক্ষের বিরোধ গত কয়েকমাস চরম আকার ধারণ করে। নিহত আবুল হাসেমের প্রভাবের কাছে অপর দুইপক্ষ কোনঠাসা হয়ে পড়ে। 

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, আবুল হাসেম ও ননা মিয়া পরিবার বিএনপি রাজনীতিতে জড়িত, অপরদিকে হাদা ব্যাপারি পরিবারের আবু সুফিয়ান মেম্বার ছাড়া সবাই বিএনপি রাজনীতিতে জড়িত। তিনটি পরিবার সোনাগাজীতে বিএনপি নেতৃত্বের সাথে সখ্যতা বজায় রেখে চলতেন।

সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) বায়েজিদ আকন বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ উদগাটন ও হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ একজন কে আটক করেছে। ময়না তদন্তের জন্য নিহতের লাশ ফেনী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত