পোপের শেষকৃত্যে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ড. ইউনূস

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:১৬ এএম

রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসকে শেষ বিদায় জানিয়েছে হাজারো শোকাহত মানুষ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। গতকাল শনিবার ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরে রোমের সান্তা মারিয়া মাজ্জোরে ব্যাসিলিকায় পাপ ফ্রান্সিসের মরদেহ  সমাহিত করা হয়।

পোপ ফ্রান্সিসের শেষ বিদায়ের প্রার্থনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইতালির ৯১ বছর বয়সী পুরোহিত জিওভান্নি বাত্তিস্ত রে। ভ্যাটিকানের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা) শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে পোপ ফ্রান্সিসের কফিন নিয়ে আসা হয়। উপস্থিত জনতা তখন নীরবতা ভেঙে করতালি দেন। এ সময় কার্ডিনাল জিওভান্নি বাত্তিস্ত রে বলেন, মানবিক উষ্ণতায় পরিপূর্ণ এবং আজকের চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল পোপ ফ্রান্সিস সত্যিই এই সময়ের উদ্বেগ, দুর্ভোগ এবং আশা ভাগ করে নিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই যখন ১৪ জন সাদা গ্লাভস পরা বাহক একটি বড় ক্রুশ খোদাই করা কফিন সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা থেকে বের করে স্কোয়ারে নিয়ে আসে, তখনো করতালির ঝড় ওঠে। ভ্যাটিকানের উপরিভাগ থেকে দেখা যায় রঙের এক মোজাইকু বিশ্বনেতাদের কালো পোশাক, প্রায় ২৫০ জন কার্ডিনালের লাল পোশাক, প্রায় ৪০০ জন বিশপের বেগুনি পোশাক এবং ৪০০০ পুরোহিতের সাদা পোশাক। ইতালীয়, স্প্যানিশ, চীনা, পর্তুগিজ ও আরবিসহ কয়েকটি ভাষায় প্রার্থনা করা হয় এবং কোরাস দল লাতিন স্তোত্র গান পরিবেশন করে। যা ১৪ লাখ সদস্যবিশিষ্ট রোমান ক্যাথলিক চার্চের বৈশ্বিক বিস্তৃতি প্রদর্শন করে।

শেষকৃত্য অনুষ্ঠা বিদেশি অতিথিদের বসার জায়গায় একেবারে সামনের সারিতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার স্ত্রী জিল বাইডেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ব্রাজিলের লুলা দ্য সিলভাসহ অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা ভ্যাটিকানে পৌঁছেছেন। রোমে পৌঁছানো অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে ছিলেন আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, গ্যাবন, জার্মানি, ফিলিপাইন এবং পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতিরা, ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং স্পেনের রাজা-রানীসহ অনেক রাজপরিবারের সদস্য।

বিশ্বাসী ও ভক্তরা শুক্রবার রাত থেকেই সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে আসতে শুরু করে। ভ্যাটিকানের হিসাবে, অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রায় ২ লাখ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া গত তিন দিনে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পোপ ফ্রান্সিসকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এ সময় তার দেহ খোলা কফিনে বিশাল ষোড়শ শতাব্দীর ব্যাসিলিকার বেদির সামনে রাখা ছিল। ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া নিজেদের আসন গ্রহণের আগে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় ফ্রান্সিসের কফিনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শুক্রবার রাতে কফিন সিল করে বন্ধ করা হয়।

গত প্রায় ১৩ শতাব্দীর মধ্যে প্রথম অ-ইউরোপীয় পোপ ফ্রান্সিস রোমান ক্যাথলিক চার্চকে পুনর্গঠনের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ধনী দেশগুলোকে অভিবাসীদের সহায়তা ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আহ্বান জানিয়েছিলেন। পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভ্যাটিকানের নয় দিনের আনুষ্ঠানিক শোককাল শুরু হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতালি ও ভ্যাটিকান সিটির কর্র্তৃপক্ষ বড় ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হয়েছে। যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ছোট নগররাষ্ট্রটির বিভিন্ন ভবনের ছাদে স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছে। পোপ দ্বিতীয় জন পলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর ইতালি ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর্জেন্টিনার বংশোদ্ভূত পোপ ফ্রান্সিস গত সোমবার ৮৮ বছর বয়সে মারা যান। তিনি ১২ বছর ধরে পোপের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় গির্জাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে কাজ করেছেন ফ্রান্সিস।

পোপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ড. ইউনূস : পোপ ফ্রান্সিসের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সেন্ট পিটার্স বাসিলিকায় প্রবেশ করলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ভ্যাটিকানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্বাগত জানান। পোপ ফ্রান্সিসের কফিনের সামনে নীরবতা পালন করে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ড. ইউনূস। এরপর তিনি বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশের নেতাদের সঙ্গে দুই ঘণ্টা ধরে চলা শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শুরুর আগে এবং পরে প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, যাদের মধ্যে ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট, মন্টেনেগ্রোর প্রেসিডেন্ট, লুক্সেমবার্গের গ্র্যান্ড ডিউক ও গ্র্যান্ড ডাচেস, ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট, পূর্ব তিমুরের প্রেসিডেন্ট, হন্ডুরাসের প্রধানমন্ত্রী, আইসল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট, পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট, বেলজিয়ামের রাজা ও রানী, বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী, মোনাকোর প্রিন্স আলবার্ট, নরওয়ের প্রিন্স ও প্রিন্সেস, তিউনিশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, লিচেনস্টাইনের প্রিন্স ও প্রিন্সেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি টমাস বাখ, শ্রীলঙ্কা, বাহরাইন এবং সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত