অর্থশাস্ত্রে অনেক জটিল বিষয় আছে, যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনেকের জানা নেই। কোনো কিছু না জানা দোষের কিছু নয়, তবে না জেনে জানার ভান করলে সমস্যা বাধে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নব্য-ধ্রুপদী (নিও-ক্লাসিক্যাল) মডেলের ধারণাদাতা হলেন রবার্ট সোলো, যিনি ১৯৮৭ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত তত্ত্বে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বিখ্যাত অর্থনীতিবিদের রসালো ও তীর্যক মন্তব্য মনে হবে যেন মিছরির ছুরি। তিনি বলেছেন, ‘‘প্রচারণার ক্ষুধায় কাতর অর্থনীতিবিদরা তাদের জ্ঞান অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করেন... অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আপাতদৃষ্টে অর্থনীতি বিজ্ঞানকে সামনে নেওয়ার কোনো অভিপ্রায় নেই এবং অর্থনীতির জটিলতর প্রশ্নের উত্তর দিতেও তারা প্রস্তুত নন। সবচেয়ে বড় কথা, তারা ‘আমি জানি না’ বলতে নারাজ।”
রবার্ট সলো হয়তো জানতেন না যে, বিশেষত এই উপমহাদেশে, ‘আমি জানি না’ কথাটা বলার মধ্যে বেশ একটা অসুবিধাও আছে। গল্পে আছে যে- দুই গ্রামের দুই হেডমাস্টারের মধ্যে কে বড় পন্ডিত, তা নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করা হয়। একজন অন্যজনকে প্রশ্ন করবে এবং প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে পরাজিত বলে গণ্য করা হবে। প্রথমেই এক হেডমাস্টার তার প্রতিপক্ষকে প্রশ্ন করলেন- ‘বলুন তো, আই ডোন্ট নো কথাটার অর্থ কী?’ অপর হেডমাস্টার চটজলদি উত্তর দিলেন, ‘এর অর্থ আমি জানি না’। আর যায় কোথায়। এ কথা শুনেই প্রতিপক্ষ এবং সমর্থক সমস্বরে বলে উঠল, ‘ও হো, সে জানে না, সে জানে না... ওদের হেডমাস্টার জানে না’, এবং এভাবেই তারা বিজয় ছিনিয়ে নিল ও স্লোগান দিতে দিতে স্থান ত্যাগ করল। অন্য কোথাও হোক না হোক, অন্তত এই বাংলাদেশে অর্থনীতিবিদরা যে ‘আমি জানি না’ বলতে নারাজ, তা সম্ভবত ওই ধরনের ভয় থেকেই। যাক সে কথা।
দুই. স্থূল কল্পনায় যদি কখনো কেউ অর্থনীতিকে একটা গাড়ির সঙ্গে তুলনা করতে চায়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ওই গাড়ির ইঞ্জিন। যে সমস্ত উপাদান দিয়ে প্রবৃদ্ধি সংঘটিত হয়, তা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির চাকা এবং যার নেতৃত্বে অর্থনীতির বাসটি চলে- অর্থাৎ বাসের স্টিয়ারিং যার হাতে তার নাম সরকার বা বাজার। স্টিয়ারিংটি যদি সরকারের হাতে থাকে, তা হলে সেটিকে বলা হবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি (কমান্ড ইকোনমি)- অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক। হোক সে উৎপাদন, বণ্টন, উদ্ভাবন, প্রশাসন ইত্যাদি। এখানে ব্যক্তিমালিকানা বলে কিছু নেই, সব সম্পদের মালিক রাষ্ট্র।
অপরপক্ষে, বাজার অর্থনীতিতে স্টিয়ারিংটি থাকে মূলত ব্যক্তি খাতের হাতে। যেমন বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ ব্যক্তিমালিকানায় বিনিয়োগ। এই ধরনের অর্থনীতিতে সম্পদের সন্নিবেশ ও বিতরণ ঘটে মূলত দাম-সংকেতের মাধ্যমে (প্রাইস সিগন্যাল)। এ দুয়ের মাঝখানে আরেকটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আছে যার নাম, মিশ্র অর্থনীতি। যেমন ঘরের তেমন ঘাটের, যেখানে সরকার ও বাজার উভয়েরই কিছু না কিছু ভূমিকা থাকে। অবশ্য, সময়ের বিবর্তনে এবং বিশেষত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে, অর্থনীতি নামক গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাতবদল হতে পারে। যেমন, স্বাধীনতা-উত্তর কিছু সময় আমাদের অর্থনীতির স্টিয়ারিংটি ছিল প্রধানত সরকারি খাতের হাতে। তারপর ধীরে ধীরে সেটি ব্যক্তি খাতের নেতৃত্বে চলে যায়। ভারতের অবস্থাও অনেকটা তেমনি। রাশিয়ার পুরো অর্থনীতিটা এক সময় ছিল কমান্ড ইকোনমি। এখন পুরোপুরি বাজার অর্থনীতি। চীন কমান্ড থেকে বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে বটে, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো সরকারি খাত বেশ শক্তিশালী রয়ে গেছে। পুরোপুরি কমান্ড ইকোনমি বলতে যা বোঝায়, তা বর্তমান যুগে একমাত্র উত্তর কোরিয়া ও কিউবা ছাড়া অন্য কোথাও আছে বলে মনে হয় না। মনে রাখা দরকার যে, উভয়ক্ষেত্রে পার্থক্য শুধু স্টিয়ারিং কার হাতে তা নিয়ে। ইঞ্জিন ও চাকার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে।
তিন. বাজেট ভাষণে, কোনো থিংকট্যাংক আয়োজিত সংলাপে, সংবাদপত্রের কলাম কিংবা টিভি টকশোতে প্রায়ই অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে অভ্যন্তরীণ মোট উৎপাদন (জিডিপি) ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। উৎপাদন বৃদ্ধিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রধান ফটক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যে হারে এই জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, তাকে বলে প্রবৃদ্ধির হার। সোজা কথায়, যদি গেল বছর জিডিপি হয়ে থাকে ১০০ টাকার এবং এ বছর ১০৭ টাকার, তা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বছরে একটা দেশে সর্বমোট যত পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার চলমান বাজার দাম হলো জিডিপি। যেমন, চলমান অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট যত পণ্য ও সেবা উৎপন্ন হয়েছে, বাজারমূল্যে তার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ কোটি টাকা (৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এটাকে বলে নমিনাল জিডিপি উৎপাদিত পণ্য ও সেবার চলতি বাজার দরে। সুতরাং, আপাতদৃষ্টিতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে বছরান্তে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে তা কী কারণে অথবা আদৌ বৃদ্ধি পেয়েছে কি না তা কিন্তু স্পষ্ট নয়। এক্ষেত্রে দুটো কারণে জিডিপি বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রথমত, উৎপাদন একই অবস্থায় থেকে শুধু মূল্যবৃদ্ধির কারণে জিডিপি বেড়ে থাকতে পারে। (যেহেতু জিডিপি= উৎপাদন গুণ বাজারমূল্য) এবং দ্বিতীয়ত, বাজারমূল্য একই অবস্থায় থেকে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির কারণেও এমনটি ঘটে থাকতে পারে (দাম এবং উৎপাদন উভয়ের বৃদ্ধি ঘটলে যে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না)। সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে দেশের উৎপাদন বেড়েছে কি না তা জানতে হলে এই এক বছরের ব্যবধানে জিনিসপত্রের দাম কতটুকু বেড়েছে তা বিবেচনায় নিতে হবে। যখন কোনো একটা বিশেষ বছরের বাজার দামে বর্তমান বছরের জিডিপি হিসাব করা হয়, সেটা হবে প্রকৃত জিডিপি।
চার. একটা দেশের উৎপাদন সম্ভাবনা রেখা যখন বিস্তৃত হয়, স্বাভাবিকভাবেই তখন ধরে নেওয়া হয় যে, দেশটিতে পণ্য ও সেবার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খুব কাছাকাছি ধারণা হচ্ছে কী হারে বা কী গতিতে মাথাপিছু উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটে? (মোট উৎপাদনকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যা দাঁড়ায়)। মাথাপিছু উৎপাদন বৃদ্ধির তাৎপর্য হচ্ছে, এর ফলে জীবনমানের উন্নতি ঘটে। সুতরাং, অর্থনীতিবিদদের করোটিতে সবসময় মাথাপিছু উৎপাদন বৃদ্ধি একটা মুখ্য লক্ষ্য হিসাবে থাকতে হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোত্থেকে বা কীভাবে সংঘটিত হয়? কথায় আছে, সব রাস্তা রোমের দিকে ধাবমান (অল রোড্স লিড টু রোম), তেমনি নানান পথ ধরে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন আসে। ১৮শ শতকে ব্রিটেন যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাঘ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, সেটা কেমন করে সম্ভব হয়েছিল তা সবার জানা যেমন, শিল্পবিপ্লবের সূচনা, স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং মুক্তবাণিজ্য নীতি পরিচালনা ইত্যাদি। অথচ এই দৌড়ে একটু পরে যোগ দেওয়া জাপান প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের পথে হেঁটেছে ভিন্নভাবে। যেমন বিদেশি প্রযুক্তি অনুকরণ, আমদানি থেকে নিজের অর্থনীতি সংরক্ষিত রাখা এবং পরবর্তী সময়ে ম্যানুফ্যাকচারিং ও ইলেকট্রনিকস খাতে দেশজ দক্ষতার উন্নতি ইত্যাদি। ভিন্ন পথ থাকতেই পারে, তবে শেষ ঠিকানা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বস্তুত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের যে সমস্ত মৌলিক উপাদান জাপান ও ব্রিটেনে কাজ করেছে, সেই একই মৌলিক উপাদান আজও কাজ করছে ভারত, বাংলাদেশ কিংবা চীনের ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চার চাকার ওপর ভর করে হাঁটে। স্টিয়ারিং যার হাতেই থাক না কেন, এই চার চাকা বা উপাদান ছাড়া প্রবৃদ্ধি নামক ইঞ্জিন গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে না। চাকা পাংচার হলে, অর্থনীতি নামক গাড়িটি বসে পড়বে। অর্থনীতির চাকাগুলো হচ্ছে : মানব সম্পদ (শ্রমশক্তির জোগান, শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও আগ্রহ); প্রাকৃতিক সম্পদ (জমি, খনিজ, জ্বালানি, পরিবেশ-মান); পুঁজি সঞ্চয়ন (মেশিনারি, যন্ত্র, কারখানা, রাস্তা); প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবস্থাপনা, উদ্যোগ। বলাবাহুল্য যে, নানা কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হচ্ছে সাড়ে তিন শতাংশের মতো। আপাতদৃষ্টে অপেক্ষাকৃত কম প্রবৃদ্ধি, কিন্তু যদি গুণগত প্রবৃদ্ধি হয় তা হলে মন্দ হয় না। প্রবৃদ্ধির পরিমাণগত দিক এতকাল আমাদের মননে বাসা বেঁধেছিল বলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সময় এসেছে, প্রবৃদ্ধির গুণগত দিক অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া। আশা করছি, সে পথেই আমরা হাঁটছি।
লেখকঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়