এক সময়ের মুনাফায় থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) লোকসান এখন অন্তত ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এরপরও কর্মকর্তারা তাদের পদপদবি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) সংশোধনের মাধ্যমে নতুন ২৯৩টি পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যার মধ্যে ২৭৬ জনই কর্মকর্তা। এতে বছরে ব্যয় বাড়বে অন্তত ৩০ কোটি টাকা। ফলে লোকসানের ভারে ন্যুব্জ হওয়া প্রতিষ্ঠানটির লোকসান আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এমন এক পরিস্থিতিতে ডেসকো ব্যয় বৃদ্ধির এ অর্গানোগ্রাম পাস করার উদ্যোগ নিয়েছে, যখন সরকার দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও একাধিকবার তার অধীনে থাকা তিনটি মন্ত্রণালয়ের অযাচিত ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অযাচিত ব্যয় কমিয়েছে, অনেকে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধা নেওয়া কর্মকর্তাদেরই আরও বেশি সুবিধা দিতে পরিবর্তিত এ সময়ে ডেসকোর অর্গানোগ্রাম পাস করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা বলছেন, ওই অর্গানোগ্রাম সংশোধন হলে ডেসকোর লোকসান বৃদ্ধির পাশাপাশি আগের সময়ের সুবিধাভোগীরা নতুন করে আবারও বাড়তি সুবিধা পাবেন। বঞ্চিতরা বঞ্চিত হবেন আগের মতোই। সেই সঙ্গে গ্রাহকসেবার মানও কমে যাবে।
এর আগে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের গোড়ার দিকে তড়িঘড়ি করে অর্গানোগ্রাম সংশোধনের মাধ্যমে নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে গত বছর ৩ সেপ্টেম্বরে দেশ রূপান্তরে ‘৮০০ কোটি লোকসান তবুও জনবল বাড়াতে তোড়জোড়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে শুরু হয় সমালোচনা। একইদিন বিকেলে ডেসকোর বোর্ডসভায় প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলে বোর্ডের সদস্যরা তাতে সায় দেননি।
এরপর বেশ কিছুদিন এটা নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয়নি। নতুন করে অনেকটা হঠাৎ করেই এখন সেই অর্গানোগ্রাম সংশোধনের আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে গতবারের প্রস্তাবে প্রায় ২৩০ জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে অন্তত ১৫০ জন প্রধান প্রকৌশলী থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা। বাকি ৮০ জন কর্মচারী। এবার ২৯৩টি কর্মকর্তার পদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ জন কর্মচারী; বাকিগুলো কর্মকর্তার পদ।
ডেসকোর বর্তমান অর্গানোগ্রামে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ২ হাজার ২১১টি পদ রয়েছে। যার মধ্যে কর্মরত ১ হাজার ৯৬১ জন। নতুন করে ২৯৩টি পদ সৃষ্টির ফলে সবমিলে এখনকার চেয়ে ৫৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়বে।
প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সমমানের পদগুলোতে ১২০ জন লোকবল বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে ৯৬ জন এবং উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে ৬০ জনসহ সবমিলে ২৭৬ জন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে।
মঙ্গলবার ডেসকোর যে বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, সেখানে অর্গানোগ্রাম সংশোধনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
অর্গানোগ্রামটি অনুমোদন হলে কর্মকর্তার পদ বৃদ্ধির ফলে শুধু তাদের বেতন-ভাতা, গাড়ি বাবদ বছরে অন্তত ২৪ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক সুবিধা মিলে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে প্রতিষ্ঠানটির। বর্তমানে শূন্য পদসহ নতুন পদে নিয়োগ দেওয়া হলে সেই ব্যয় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঢাকা এবং গাজীপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেসকো এক সময় মুনাফা করত। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে তাদের মুনাফা হয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৪১ কোটি এবং পরের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ৫০৫ কোটি লোকসান হয়েছে তাদের। সেই লোকসান বেড়ে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির লোকসান হয়েছে ৭৭৩ কোটি টাকা। সবমিলে এখন পর্যন্ত লোকসান হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এ লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কিনে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য এত প্রধান প্রকৌশলী, এত এত কর্মকর্তার তো কোনো দরকার নেই। এটা তো খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। এগুলো অলিগার্ক তৈরির একটা ব্যবস্থা।’
অর্গানোগ্রাম সংশোধনের এ প্রস্তাব লুণ্ঠনের শামিল আখ্যায়িত করে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এতে ভয়ংকর রকমের অর্থের তছরুপ হবে। কর্মকর্তাদের সুবিধা দিতে গিয়ে লোকসানের অজুহাতে আবার গ্রাহকের বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেবে তারা। মূলত এসব কারণে আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে অতীতে। এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ। যাদের মাথা থেকে এসব প্রস্তাব এসেছে, তারা গণশত্রু।’
ডেসকোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, নতুন অর্গানোগ্রাম পাস হলে আউটসোর্সিংয়ের জনবল বাড়বে। তাদের গ্রাহকসেবার মান কমবে। এতে মাঠপর্যায়ে কাজের কারিগরি লোক কমে যাবে। ঠিকাদার নির্ভরশীলতা বাড়বে। মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণও কমে যাবে। চুরি, মিটার টেম্পারিং বৃদ্ধির ফলে সিস্টেম লস বেড়ে রাজস্ব আয় হ্র্রাস পাবে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতাবঞ্চিত ৭৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বৈষম্যের প্রতিকার চেয়ে গত বছর ২১ আগস্ট ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন। কিন্তু সেই দাবি আমলে না নিয়ে সুবিধাভোগীদের আরও সুবিধা দিতে অর্গানোগ্রাম সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
তারা বলছেন, একজন সহকারী প্রকৌশলী চাকরি শুরুর পর সাত বছরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং পরবর্তী চার বছরে নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার কথা। কিন্তু ১২ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করেও এখন পর্যন্ত অনেকেই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে চাকরি করছেন। অন্যান্য পদেও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন অনেকেই। অনেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে থেকেই অবসরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সুবিধাভোগীরা তরতর করে এগিয়ে গেছেন।
প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত রবিবার ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদকে ফোন দেওয়া হলে তিনি সরাসরি অফিসে দেখা করার পরামর্শ দেন।
গতকাল দুপুরে তার কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাজেদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। জানতে চাইলে সাজেদুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অনেকের পদোন্নতি হচ্ছে না। বঞ্চিতদের জন্যই এ অর্গানোগ্রাম সংশোধন করা হচ্ছে। তাছাড়া মন্ত্রণালয়েরও সম্মতি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এতে ব্যয় বাড়বে না। কারণ পদোন্নতি না পেলেও বেতন বৃদ্ধির ফলে ওই পদের সমমান হয়েছে। আবার কারও কারও পদোন্নতি পেলে এখন যে বেতন পাচ্ছেন, তা ওই পদের বেতনের চেয়ে বেশি।’
সরকারের আরেক বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসির রেফারেন্স দিয়ে সাজেদুল করিম বলেন, ‘ডিপিডিসিতে একজন জনবলের বিপরীতে ২০০ জন গ্রাহক। সেখানে ডেসকোর প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম সংশোধনের পরও এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৫০-এ।’
তবে তার এ বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ডিপিডিসির ডিসেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৩ হাজার ২০৭ জন। এর বিপরীতে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ১৮৬ জন। অর্থাৎ প্রতি জনবলের বিপরীতে ৫৭২ জন গ্রাহক রয়েছেন। অন্যদিকে ডেসকোর বর্তমানে গ্রাহকসংখ্যা ১৩ লাখ ৪০ হাজার ১২৭ জন।
ডিপিডিসিতে তিনজন মহাব্যবস্থাপক রয়েছেন। কিন্তু ডেসকোতে পাঁচজন মহাব্যবস্থাপক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অথচ ডিপিডিসির চেয়ে তাদের গ্রাহক কম। একইভাবে উচ্চপর্যায়ের অন্যান্য পদে লোকবল বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ডেসকোর সংশোধনের প্রস্তাব উঠলে প্রতিষ্ঠানটির ৪২৩তম বোর্ডসভায় জনবল বৃদ্ধির যথার্থতা যাচাই করতে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন লোকবল যথাযথ পদে আছে কি না, প্রকৃত চাহিদা কত এবং অন্যান্য বিষয় যাচাই করতে অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখন প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম তৈরিতে সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাজেদুল করিম বলেন, ‘কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কারণ তাদের চেয়ে আমরাই তো বেশি অভিজ্ঞ।’
প্রতিষ্ঠানের লোকসানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন ‘কোথায় লোকসান।’ এ সময় তাকে বার্ষিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘ওই লোকসান হয়েছে মূলত বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির ফলে।’
যদিও লোকসানের দোহাই দিয়ে ২০২৩ সালে প্রথম দুই মাসে সরকার নির্বাহী আদেশে তিন দফায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে। এরপরও সাজেদুল করিমের এ বক্তব্য কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ডেসকোর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি আর অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কারণেই মূলত লোকসান বেড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ডেসকোতে নিয়োগ পদোন্নতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ সাবেক সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদের দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে গত কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি। এ ছাড়া নিয়োগ-পদোন্নতিতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ঘুষবাণিজ্য হিসেবে।
নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করল এনসিপি
দেশের পথে খালেদা জিয়া: অভ্যর্থনা জানাতে বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি
এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯.১৭ শতাংশ