শেষ হতে চলেছে আরেকটি ফুটবল মৌসুম। অথচ বছরের পর বছর জমতে থাকা বকেয়ার অঙ্ক বেড়েই চলছে। যা এখন দুই কোটি টাকা ছুঁইছুঁই। তাই বাধ্য হয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশের সব ফুটবল রেফারি। ‘নো বিল, নো গেম’- এই কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে আর ভুলবেন না। পকেটের টাকা খরচা করে দিনের পর দিন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ম্যাচ পরিচালনা করা রেফারিদের দাবি একটাই- বকেয়া পেলেই ম্যাচ পরিচালনা করবেন। নইলে না।
ফুটবল রেফারিরা এ দেশে শুরু থেকেই অবহেলিত। তাদের জন্য নেই কোনো মাসিক বেতনের ব্যবস্থা। অ্যাসাইনমেন্ট পেলেই তাদের হিসাবের খাতায় যোগ হয় সম্মানী ও ভাতার অঙ্ক। অনেকটা ‘কাজির গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই’-এর মতো অবস্থা।
এমনিতেই রেফরিং থ্যাংকসলেস জব। এছাড়া ঝুঁকি তো আছেই। এসব সত্ত্বেও রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঘাম ঝরানোর সম্মানীটা যদি ঠিকঠাক না মেলে, কতদিন মেনে নেওয়া যায়? তারপরও মুখ বুজে তারা দিনের পর দিন ম্যাচ পরিচালনা করছেন। অথচ তাদের ত্যাগ, অবদানটা ফুটবল কর্তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। পায় না বলেই বাড়তে থাকে বকেয়ার অঙ্ক। এই বঞ্চনা এখন পৌঁছে গেছে অসহনীয় পর্যায়ে।
বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার কথা দিয়েছিলেন বুধবারের মধ্যে ফেডারেশন কাপের বকেয়া বুঝিয়ে দেবেন। আরও প্রতিশ্রুতি ছিল লিগ শেষ হওয়ার আগেই বুঝিয়ে দেওয়া হবে আগের সব বকেয়া। তবে এবারও প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন বাফুফের নির্বাহী প্রধান। বুধবার রেফারিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি কানাকড়িও। তাতেই বিগড়ে গেছেন রেফারিরা। ঠিক করেছেন প্রাপ্য বুঝে না পেলে শুক্রবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১৪তম রাউন্ড ও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের ম্যাচ পরিচালনা করবেন না।
জানা গেছে, ২০২১-২০২২ ও ২০২২-২০২৩ এ দুই মৌসুমের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বকেয়া রেফারিদের। বিপিএল, বিসিএল, বয়সভিত্তিক ক্লাব ফুটবল ও মহানগর লিগ কমিটির অধীনস্ত লিগগুলো ম্যাচ পরিচালনা করে এই বকেয়া বুঝে পাননি তারা। ২০২৩-২০২৪ মৌসুমে রেফারিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বাফুফের বিগত কমিটির সহ-সভাপতি ও বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান। সে সময় তিনি বাফুফের ফাইন্যান্স কমিটি ও পেশাদার ফুটবল লিগ কমিটির অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন। প্রতিশ্রুতি ঠিকই পূরণ করেছেন ইমরুল হাসান। রেফারিদের বুঝিয়ে দিয়েছেন সেই মৌসুমের সব প্রাপ্য। বাফুফের নতুন কমিটি এখনো রেফারিজ কমিটি গঠন করেনি। তাই রেফারিরা এখন অভিভাবকশূন্য। বিগত কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদীর বেখেয়ালিপনায় বেড়েছে বকেয়ার অর্থ।
দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান কমিটিও হাঁটছে একই পথে। চলতি মৌসুমে রেফারিদের সম্মানী ও ভাতার গতি থমকে গেছে। বিপিএল-এর ১৩ রাউন্ডের খেলা হয়েছে। রেফারিরা পেয়েছেন প্রথম পাঁচ রাউন্ডের ২৫ ম্যাচের সম্মানী ও ভাতা। বাকি আছে আট রাউন্ডের ৪০ ম্যাচের ম্যাচ ফি ও দৈনিক ভাতা। ফেডারেশন কাপের এক পয়সাও জুটেনি। এসব হিসাব করলে চলতি মৌসুমের কমবেশি ৫৫ লাখ টাকা বকেয়া হয়ে গেছে। আগের বকেয়া আর বর্তমানেরটা যোগ করলে যা ২ কোটির কাছাকাছি।
বকেয়া নিয়ে দুই মাস আগে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন প্রায় ৩০ জন রেফারি। রেফারিরা জানান, সেই সভায় বকেয়া দ্রুত পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাফুফে সভাপতি। সেই সভায় সবার সামনেই তাবিথ রেফারিদের পাওনা পরিশোধের জন্য একটা চেকে স্বাক্ষর করার কথা বলেছিলেন। সেটা কেন রেফারিদের হাতে পৌঁছায়নি, জানতে চেয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক ইমরানের কাছে। ইমরান সেই চেক দিয়ে উত্তোলিত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার কথা সভাপতিকে জানান। তারপরও বাফুফে সভাপতির আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে কাজ চালিয়ে গেছেন রেফারিরা। এর মধ্যে ইমরান কমপক্ষে তিনবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ করেননি। সর্বশেষ বুধবার ফেডারেশন কাপের সব বকেয়া পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও বকেয়া হয়ে গেছে।
বিপিএল-এর একটি ম্যাচ পরিচালনা করলে একজন রেফারি ম্যাচ ফি পান ৫০০০ টাকা। সহকারী রেফারিরা ৪৮০০ টাকা ও চতুর্থ রেফারি পান ৪৫০০ টাকা। এছাড়া থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন তারা। ঢাকার রেফারিরা ময়মনসিংহ কিংবা কুমিল্লায় ম্যাচ পরিচালনা করলে থাকা-খাওয়া বাবদ দৈনিক পান ২০০০ টাকা। আর যাতায়াত বাবদ পান ২০০০ টাকা। ঢাকা ও এর কাছাকাছি ভেন্যুতে ম্যাচ হলে ম্যাচ ফি আর একদিনের দৈনিক ভাতা পাওয়া যায়। আর ঢাকার বাইরের রেফারিদের জন্য অঙ্কটা কমবেশি হয়। ২০২১-২০২২ মৌসুম থেকে এই হিসাব চলছে। তবে বাফুফের পাওনা পরিশোধে গড়িমসির ফলে এই ব্যয় নিজেদের বহন করতে হয় রেফারিদের।
ভারত এক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে অনেকটাই। তারা রেফারিদের মাসিক বেতনের আওতায় নিয়ে এসেছে। ম্যাচ ফি ও ভাতার বাইরে মাসে ভারতীয় রেফারিরা প্রতিমাসে ভালো অঙ্কের বেতন পান। পিছিয়ে নেই নেপাল, ভুটানও। ভারতের তুলনায় কম হলেও মাস শেষে বেতন পাচ্ছেন তাদের রেফারিরাও। বাংলাদেশ কখনই হাঁটেনি এ পথে। তাই বাধ্য হয়ে রেফারিদের অন্য জীবিকা বেছে নিতে হয়।
নিজের অন্য চাকরি বাঁচিয়ে রেফারিং করা সহজ নয়। হাড়ভাঙা কষ্টের ফলটা নিয়মিত মেলে না বলেই মনঃসংযোগে বিঘ্ন ঘটে। তাই মাঠে অনেক সময় রেফারিদের সিদ্ধান্ত ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনটাই হতে থাকবে যদি বাফুফের কর্তাদের ঘুম না ভাঙে।
টেস্ট ক্রিকেট অবসরের ঘোষণা রোহিত শর্মার
ইন্তার-বার্সা 'পাগলামি' সেমিফাইনালকে রাখবেন কতো নম্বর স্থানে