কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার প্রকাশ নয়, বরং বৈশ্বিক সমরাস্ত্র বাণিজ্যের জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণের একটি প্রতিচ্ছবি। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি, তারা এখন পর্যন্ত ৭৭টি ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তাদের ভূখণ্ডে হামলায় ভারত ইসরায়েল নির্মিত হারোপ ড্রোন ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ জানিয়েছে, গত ৮ মে সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৯টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। এরপর গতকাল দুপুর পর্যন্ত আরও ৪৮টি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়। পাশাপাশি ইসলামাবাদ দাবি করেছে, তারা ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। এরমধ্যে অন্তত দুটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমানের অন্তত একটি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়নি। তবে ভারত এসব দাবি অস্বীকার করেছে। এই সংঘাতে ব্যবহৃত সমরাস্ত্রগুলো ইসরায়েল, চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগৃহীত। ফলে এটি এখন আর শুধু ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক সমরাস্ত্র বাণিজ্যের বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, গত বুধবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভারতের পাঠানো হারোপ ড্রোনগুলো লাহোর, করাচি, রাওয়ালপিন্ডিসহ বিভিন্ন স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করে পাঠানো হয়েছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাদের ‘সফট-কিল’ (প্রযুক্তিগত) এবং ‘হার্ড-কিল’ (অস্ত্রভিত্তিক) কৌশল ব্যবহার করে এগুলো নিষ্ক্রিয় করেছে। আইএসপিআর আরও দাবি করেছে, ৬ মে ভারতের বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের পাল্টা আক্রমণে ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ও একাধিক ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যা ভারতকে আতঙ্কিত করেছে। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে রয়টার্স নিশ্চিত করেছে, গত মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তান চীনের তৈরি জে-১০ সি ভিগোরাস ড্রাগন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের অন্তত দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে একটি ছিল ফ্রান্সের তৈরি রাফাল। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তারা জানিয়েছেন, পাকিস্তানের হাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়নি। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ দাবি করেছেন, তিনটি রাফাল ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ভারতের বিমানবাহিনী এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
এই সংঘাতে ব্যবহৃত সমরাস্ত্রগুলোর উৎস বিশ্লেষণ করলে বৈশ্বিক রাজনৈতিক জোটের একটি জটিল চিত্র ফুটে ওঠে। ভারতের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি হারোপ ড্রোন এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান তাদের সামরিক কৌশলের মূল অংশ। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে। হারোপ ড্রোন, যা ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই) নির্মাণ করে, ভারতের নজরদারি ও নির্ভুল হামলার ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই ড্রোনগুলোর ব্যবহার ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের কৌশলগত গভীরতার ইঙ্গিত দেয়, যা শুধু সামরিক নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান ভারতের বিমানবাহিনীর মেরুদণ্ড। ২০১৬ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে ৭.৮ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তির মাধ্যমে ভারত ৩৬টি রাফাল ক্রয় করেছে। এই যুদ্ধবিমানগুলোর উন্নত প্রযুক্তি ও বহুমুখী ক্ষমতা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে পাকিস্তানের দাবি সঠিক হলে তা ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি ধাক্কা হতে পারে। কারণ এটি রাফালের খ্যাতি ও বাজারমূল্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এরই মধ্যে যা প্রতীয়মানও হয়েছে। পাকিস্তানের দাবির পর থেকে গত ৮ মে যুদ্ধবিমানটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশনের শেয়ার হুড়মুড়িয়ে পড়েছে। দাসোর শেয়ারদর কমেছে ৩.৩ শতাংশ। উল্টো চিত্র পাকিস্তানের ব্যবহৃত চীনা যুদ্ধবিমান জে-১০সি এবং জেএফ-১৭ তৈরি করা চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশনের শেয়ার বাজারে। একই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান তাদের প্রধান অস্ত্র। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোটের অংশ হিসেবে বেইজিং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। জে-১০ যুদ্ধবিমান, যা চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ নির্মাণ করে, পাকিস্তানের বিমানবাহিনীকে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জে-১০ এর সফল ব্যবহার চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার প্রমাণ। এটি চীনের জন্য একটি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ, কারণ এই সাফল্য অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চীনা অস্ত্র ক্রয়ে উৎসাহিত করতে পারে। বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি জে-১০সি আছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন নির্মাণ করা এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির কাছে প্রায় ৭৫টি হলো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। তবে এই সংঘাতে এফ-১৬ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। ‘এন্ড-ইউজার চুক্তি’ ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে আঞ্চলিক সংঘাতে, বিশেষত ভারতের বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধে এগুলো ব্যবহারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই শর্ত ভঙ্গ করলে খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি বাতিল, এমনকি নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমরাস্ত্র বাণিজ্যের অর্থনৈতিক মাত্রা এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা বাজারে ইসরায়েল, ফ্রান্স, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর প্রভাবশালী অবস্থান রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২৪ সালে ভারত বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ছিল। যার বড় অংশ এসেছে ফ্রান্স, রাশিয়া ও ইসরায়েল থেকে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, চীন তাদের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, যা মোট আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ। ইসরায়েলি হারোপ ড্রোন ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দের প্রতিফলন। এই ড্রোনগুলোর উচ্চমূল্য সত্ত্বেও তাদের নির্ভুলতা ও কার্যকারিতা ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা প্রদান করছে। তবে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী এই ড্রোনগুলো ভূপাতিত হলে তা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। একইভাবে, রাফাল যুদ্ধবিমানের ক্ষতি ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এটি অন্যান্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব ফেলবে।
চীনের জে-১০ যুদ্ধবিমানের সাফল্য যদি সত্য হয়, তবে তা দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি বড় অর্জন। চীন ইতিমধ্যে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে অস্ত্র রপ্তানি করছে। জে-১০ এর কার্যকারিতা চীনের বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে এমন দেশগুলোর কাছে যারা পশ্চিমা অস্ত্রের উচ্চমূল্য বহন করতে পারে না। এফ-১৬ এর অনুপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের জন্য একটি কৌশলগত বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক হলেও, তাদের অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে রাজনৈতিক শর্ত জড়িত। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এফ-১৬ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাবেরই একটি উদাহরণ।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে সমরাস্ত্রের ব্যবহার বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারের প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ইসরায়েল, ফ্রান্স, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো শুধু অস্ত্র বিক্রি করছে না, বরং তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নিচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রে, ইসরায়েল ও ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করেছে। পাকিস্তানের জন্য, চীনের সমর্থন তাদের ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব উভয় দেশের জন্য উদ্বেগজনক। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ অস্ত্র আমদানিতে ব্যয় করে, যা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয়। এছাড়া, সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে মোটা দাগে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে সমরাস্ত্রের ব্যবহার বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার একটি প্রতিফলন। ইসরায়েলি হারোপ ড্রোন, চীনা জে-১০, ফ্রান্সের রাফাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ এই সংঘাতে শুধু সামরিক অস্ত্র নয়, বরং বিশ্বরাজনীতির কৌশলগত হাতিয়ার। এই সংঘাতের পরিণতি কেবল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিই নয়, বৈশ্বিক সমরাস্ত্র বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথকেও প্রভাবিত করবে।
