বিদেশে বেড়ে ওঠা, উন্নত কাঠামোয় গড়া ফুটবলশিক্ষা আর পেশাদার ক্যারিয়ারের গোড়াপত্তন। সব মিলিয়ে সৈয়দ শাহ কাজেম কিরমানে, সংক্ষেপে কাজেম শাহ বাংলাদেশের ফুটবল মানচিত্রে আরও একটি নতুন নাম। তবে তিনি শুধু ‘বিদেশফেরত’ পরিচয়ের মধ্যেই আটকে নেই। তার খেলায়, ব্যক্তিত্বে এবং ভাবনায় ধরা পড়ে একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার ছাপ—যার লক্ষ্য জাতীয় দলের হয়ে কিছু করে দেখানো।
কাজেম শাহের জন্ম ১৯৯৮ সালে, ঢাকায়। তবে শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে কানাডায়। সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দেশ ছেড়ে চলে যান এডমন্টনে। ফুটবলে হাতেখড়ি সেখানেই। স্কুল, কলেজ ও একাডেমি পর্যায়ে নিয়মিত খেলেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার হয়ে কলেজ ফুটবলেও নাম ছিল পরিচিত।
তার বাবা সৈয়দ হালিম শাহ নব্বই দশকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন। সুতরাং খেলাধুলার পরিবেশ পরিবারে আগে থেকেই ছিল। সেই অনুপ্রেরণাই ফুটবলে পেশাদার হওয়ার পথে তাকে এগিয়ে নেয়।
২০২১ সালে কাজেম শাহ বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে নাম লেখানোর জন্য আসেন সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের ট্রায়ালে। কোচিং স্টাফের নজরে পড়েনও। কিন্তু পাসপোর্ট-সংক্রান্ত জটিলতায় তখন চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এক বছর পর, ২০২২ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ পুলিশ এফসি তাকে দলে নেয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পেশাদার ক্যারিয়ার। এখন পর্যন্ত ৪৩ ম্যাচে মাঠে নেমে ৪টি গোল করেছেন। মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও প্রয়োজনমতো উইং বা ডিপার পজিশনেও খেলতে পারেন। খেলায় দেখান স্থিরতা, বল কন্ট্রোল ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিপক্বতা।
কাজেমের জাতীয় দলে ডাক পাওয়া সময়ের ব্যাপার ছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রাথমিক দলে জায়গা হলেও ইনজুরির কারণে খেলা হয়নি। অবশেষে ২০২৪ সালের ১১ জুন, লেবাননের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলেন। ম্যাচটি ছিল দোহার খলিফা স্টেডিয়ামে। যদিও বাংলাদেশ ০-৩ গোলে হেরে যায়, তবু কাজেমের অভিষেকটি ছিল ইতিবাচক। তিনি মাঠে ছিলেন ৬৩ মিনিট, খেলোয়াড় হিসেবে আত্মবিশ্বাসী ও দৃষ্টিসীমানা জুড়ে খেলার চেষ্টা ছিল লক্ষ্য করার মতো।
তবে বাংলাদেশের আসার আগে কটু কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন সবাই শুনেছিল বাংলাদেশ আসছি, তখন সবাই বলেছিলে ওখানে গিয়ে কি করবে। ওখানকার ফুটবল তো তলানীতে। ক্যারিয়ার তো গড়তে পারবে না। এ বিষয়টি আমার জেদ চেপেছিল। তাই শপথ করেছিলাম যেন সবাইকে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে দেখাতে পারি।’
বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর অপেক্ষায় থাকা আরেক প্রবাসী ফুটবলার শমিত সোমের সঙ্গে কাজেমের পরিচয় দীর্ঘদিনের। দুজনই কানাডার একই একাডেমিতে ফুটবল খেলেছেন। এখন জাতীয় দলের জার্সিতে তারা একসঙ্গে খেলবেন। কাজেম শমিতকে বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে প্রশংসা করেছেন, এবং তার জাতীয় দলে যোগ দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তবে কানাডা থেকে আসা একজন ফুটবলারের জন্য বাংলাদেশের গরম, আর্দ্রতা এবং মাঠের অবস্থা নতুন এক বাস্তবতা। কাজেমকেও শুরুতে এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে। তবে তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছেন নিয়মিত অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার মাধ্যমে। তাছাড়া বিপিএল ফুটবল ও আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে বলে তিনি ভাবেন।
এ বিষয়ে কাজেম বলেছেন, ‘বাংলাদেশে খেলা অনেক কষ্ট। মাঠ ও আবহাওয়া একটা বড় কারণ। তবে যেকোনো পেশাদার ফুটবলারই এসব মানিয়ে নেয় দ্রুত। শমিতের মধ্যে ঐ গুণটা আছে। কানাডায় থাকতে বহুবার দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। দলে তার অন্তর্ভুক্তি অন্য মাত্রা দেবে।’
কাজেম যোগ করেছেন, ‘এখানকার লিগের খেলা আর জাতীয় দলের খেলায় চ্যালেঞ্জ একদম ভিন্ন। তবে বিপিএলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামনে হয়তো আরও বাড়বে। কারণ ফুটবলারদের মধ্যে সামনের দিনে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সেটা সামনের দিনে আরও বাড়বে। আমাদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিটা সেখানেই নিয়ে জাতীয় দলের জন্য তৈরি হতে হবে।’
বাংলাদেশ দলে বিদেশফেরত ফুটবলারের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সবাই সফল হচ্ছেন না। কাজেম শাহের যাত্রাপথ এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক। মাঠে তার ঠান্ডা মাথার খেলা, পজিশনিং, এবং পাসিং দক্ষতা দলের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। সে সফলতা নির্ভর করবে তার ধারাবাহিকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মান ধরে রাখার উপর। তবে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়—এই প্রবাসী তরুণ দেশের ফুটবল নিয়ে ভাবেন, এবং মাঠে তার প্রতিফলন ঘটানোর মতো মেধা ও মনোভাব দুটোই তার আছে।
ব্যর্থতায় বিদায় কলকাতার, দায় স্বীকার রাহানের
পিএসএল চ্যাম্পিয়ন হয়ে কত টাকা পেলো রিশাদদের লাহোর
রিওতে পৌঁছাতেই আনচেলত্তিকে ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস